Subscribe For Free Updates!

We'll not spam mate! We promise.

Showing posts with label রোগ. Show all posts
Showing posts with label রোগ. Show all posts

লিভার ক্যান্সার

লিভার কী: লিভার মানব দেহের অতি গরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। বাংলায় যাকে আমরা কলিজা বলি। লিভারের অবস্থান হচ্ছে পেটের উপর ভাগের ডানদিকে। এর ওজন প্রায় দেড় কেজির মত। লিভার দেহের সব প্রকার খাদ্যে মেটাবিলিজম-এ সাহায্য করে। আমরা প্রতিদিন যে খাদ্য গ্রহণ করি তা লিভারের মাধ্যমে শরীরের অন্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গে সরবরাহ হয়।

লিভার ক্যান্সার: লিভার ক্যান্সার সাধারণত দুই ধরণের হয়ে থাকে। একটি প্রাইমারি ক্যান্সার ও অন্যটি সেকেন্ডরি ক্যান্সার। প্রাইমারি লিভার ক্যান্সার লিভার সেল থেকে উৎপত্তি হয়। ক্যান্সার শরীরের অন্য কোন অঙ্গ বা অন্ত্র যেমন-পাকস্থলী, ক্ষুদ্র বা বৃহৎ অন্ত্র, কিডনি ও ফুসফুস থেকে লিভারে ছড়িয়ে পড়লে তাকে সেকেন্ডারি ক্যান্সার বলে।

লিভার ক্যান্সা কেন হয়: আমাদের দেশে লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ হচ্ছে: হেপাটাইটিস বি ভাইরাস। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে এ দেশে লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত শতকরা ৭০ জন রোগীই হেপাটাইটিস জনিত রোগে ভূগছে। এর পরেই রয়েছে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস ও ফ্যাটি লিভারের অবস্থান। পাশাপাশি রয়েছে এলকোহল, মাঝে মাঝে অটোইমিউন হেপাটাইটিসের মত অখ্যাত রোগগুলোতে রয়েছেই। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে ভুগছেন, এমন শতকরা ৫ জন লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত। আর হেপাটাইটিস সি ভাইরাস ও ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে এ সংখ্যাটি যথাক্রমে ২০ ও ৩০ জন। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের এ রোগে আক্রান্ত হবার আশংকা বেশি। তবে চিকিৎসা করতে গিয়ে আমরা শিশুদের মধ্যেও হেপাটাইটিস বি জনিত লিভার ক্যান্সার খুঁজে পাই।

লিভার ক্যান্সারের লক্ষণ: যে কোনো বয়সের মানুষই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি মহিলাদের চেয়ে পুরুষদের ৪ থেকে ৬ গুণ বেশি। সাধারণত: ক্যান্সার হবার আগে লিভার সিরোসিস দেখা দেয়। তবে এর ব্যতিক্রমও দেখা যায়। এ রোগে আক্রান্তরা প্রায়ই পেটের ডান পাশে উপরের দিকে অথবা বুকের ঠিক নিচে মাঝ বরাবর ব্যথা অনুভব করেন। যার তীব্রতা রোগীভেদে বিভিন্ন রকম। সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, পেট ফাঁপা, ওজন কমে যাওয়ার সাথে হালকা জ্বর জ্বরভাব এরোগের অন্যতম লক্ষণ। লিভার ক্যান্সার রোগীদের প্রায়ই জন্ডিস থাকে না, থাকলেও তা খুব অল্প। খাওয়ার অরুচি, অতিরিক্ত গ্যাস কিংবা কষা পায়খানার কমপেস্নন থাকতে পারে। আবার কখনো দেখা দেয় ডায়রিয়া। পেটে পানি থাকতে পারে, আবার নাও থাকতে পারে।

লিভ্যার ক্যান্সার নির্ণয়: লিভার ক্যান্সার নির্ণয়ের সহজ উপায় হচ্ছে একটি নির্ভরযোগ্য আল্ট্রাসনোগ্রাম। তবে কখনো কখনো সিটি স্ক্যানেরও প্রয়োজন হতে পারে। রক্তের অঋচ পরীক্ষাটি লিভার ক্যান্সারের একটি মোটামুটি নির্ভরযোগ্য টিউমার মার্কার। লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত যে কোনো মানুষেরই উচিৎ প্রতি ৬ মাসে একবার এএফপি ও আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করানো। তবে লিভার ক্যান্সারের ডায়াগনোসিস নিশ্চিত হতে হলে আল্ট্রাসনোগ্রাম গাইডেড এফএনএসি অত্যন্ত জরুরি। মনে রাখতে হবে, অভিজ্ঞ হাতে করা এ পরীক্ষার সাফল্যের হারও প্রায় শতভাগ।

চিকিৎসা পদ্ধতি:লিভার ক্যান্সারের রোগীদের চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো হচ্ছে- কেমোথেরাপি, টিউমার অ্যাবলেশন, রিসেকশন ও লিভার প্রতিস্থাপন। ফাইভ ফ্লরোইউরাসিল, ডক্সেরুবিসিন আর টেমোক্সিফেনের মত কোমোথেরাপির ওষুধগুলো দীর্ঘদিন থেকে মন্দের ভালো হিসেবে লিভার ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহূত হয়ে আসছে। যদিও এদের কার্যকারিতা তেমন সুখকর নয়। বেশ ক'বছর থেকে বাজারে আছে কেপসসিটাবিন।

সম্প্রতি এ তালিকায় যোগ হয়েছে-সুরাফেনিব। এ ওষুধ দুটি মুখে খেতে হয় বিধায় রোগীকে হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। এর পাশর্্বপ্রতিক্রিয়াও খুবই কম। আগের ওষুধের তুলনায় কার্যকারিতাও বেশি। তবে সমস্যা হচ্ছে-এ ওষুধগুলো বেশ দামী। পাশাপাশি সুরাফেনিব বাংলাদেশে খুব বেশি সহজলভ্যও নয়।

এছাড়াও লিভার ক্যান্সারের আশাব্যঞ্জক দু'টো চিকিৎসা পদ্ধতি রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন ও পারকিউটেনিয়াস অ্যালকোহল ইঞ্জেকশন। এদুটো পদ্ধতির বেসিক একই। উভয় ক্ষেত্রেই ক্যান্সারকে দেহের বাইরে থেকে গাইডেড প্রবের মাধ্যমে পুড়িয়ে ছোট করে আনা হয়। এর মধ্যে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশনে আউটকাম পার কিউটেনিয়াস অ্যালকোহল ইঞ্জেকশনের তুলনায় সামান্য ভাল হলেও এর সীমাবদ্ধতা অনেকগুণ বেশি। প্রথমত এটি সাত থেকে আট গুণ বেশি দামী। দ্বিতীয়ত রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশনের জন্য যেসব বিশেষায়িত যন্ত্রপাতির প্রয়োজন পড়ে, তা খুবই দামী এবং আমাদের দেশে দুর্লভ। টিউমারের সাইজ খুব বড় না হলে আর রোগীর শারীরিক অবস্থা সব মিলিয়ে ভাল থাকলে অপারেশন করে টিউমার ফেলে দেয়া খুবই কার্যকর। আর এজন্য প্রয়োজনীয় কুসা মেশিন, দক্ষ হেপাটোবিলিয়ারি সার্জন আমাদের দেশে আছেন।

লিভারের যত অসুখ


লিভার শরীরের সর্ববৃহৎ অঙ্গ। আকৃতিতে যেমন বৃহৎ, প্রয়োজনীয়তার দিক থেকেও এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। শরীরকেসুখে রাখতে দরকার সুস্থ লিভার। অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত লিভার আমাদের জীবনে বয়ে নিয়ে আসে দুঃখ, কষ্ট এমনকি অকালে প্রস্থান। অন্য যে কোন যন্ত্র বা মেশিনের মত আমাদের দেহ যন্ত্রও চলে শক্তির সাহায্যে। এ শক্তি আসে খাদ্য থেকে। আমরা যেরূপে খাবার খাই তা থেকে সরাসরি শক্তি উৎপন্ন হতে পারে না। জটিল খাবার লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়ে শক্তি উৎপাদনের উপযোগী হয়ে জমা থাকে এবং প্রয়োজন মাফিক শরীরের কোষে কোষে পৌছে শক্তি উৎপাদন করে। তাই লিভারকে বলা হয় শরীরের পাওয়ার হাউজ। শুধু তাই নয়, শরীরে উৎপন্ন বিভিন্ন দুষিত পদার্থ লিভার বিশুদ্ধ করে এবং পরবর্তীতে শরীর থেকে বের করার ব্যবস্থা করে। অনিচ্ছাকৃত বা ইচ্ছাকৃত ভাবে শরীরে কোন বিষাক্ত পদার্থ প্রবেশ করলে লিভার সেটিকে বিষমুক্ত করে। বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন জাতীয় পদার্থ তৈরী করে যা শরীরের জন্য অপরিহার্য।
লিভারের যত রোগঃ
গুরুত্বপূর্ন এই অঙ্গটি নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে। কিছু রোগ বংশগত (ওহযবৎরঃবফ), কিছু রোগ অর্জিত (অপয়ঁরৎবফ)। কিছু রোগ স্বল্পস্থায়ী এবং পুরোপুরি ভাল হয়ে যায়; কিছু রোগ দীর্ঘস্থায়ী, যা জটিল থেকে জটিলতর হয়ে কেড়ে নেয় জীবন-এমনকি চিকিৎসা করা সত্ত্বেও। হেপাটাইটিস বা লিভারে প্রদাহ বিশ্ব জুড়ে লিভারের প্রধান রোগ। নানা কারনে এই প্রদাহ হতে পারে। যার অন্যতম কার এ,বি,সি,ডি,ই, নামক হেপাটাইটিস ভাইরাস। পানি ও খাবারের মাধ্যমে সংক্রমিত হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাস লিভারে একিউট হেপাটাইটিস বা স্বল্প স্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরোপুরি সেরে যায়। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি ভাইরাস। অনেক কারনেই লিভারের প্রদাহ হতে পারে। ভাইরাস ছাড়া ও অতিরিক্ত এলকোহল পান, লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়া, বিভিন্ন ড্রাগ ও কেমিক্যালস হেপাটাইটিস করে থাকে। অটোইমিউন হেপাটাইটিস, উইলসন্স ডিজিজ সহ বিভিন্ন অজানা কারণ জনিত রোগ ও বংশগত রোগে লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে।
যে কারণেই প্রদাহ সৃষ্টি হউক না কেন, দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক হেপাটাইটিস বছরের পর বছর চলতে থাকলে লিভারের কোষগুলো মরে যায়। অকার্যকর ও অপ্রয়োজনীয় ফাইব্রাস টিসু সেস্থান দখল করে জন্ম দেয় সিরোসিস নামক মারাত্মক রোগ। সিরোসিস হলে লিভারের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। আমাদের দেশে হেপাটাইটিস বি এবং সি সংক্রমনই লিভার সিরোসিসের প্রধান কারন। উন্নত বিশ্বে এ স্থান দখল করে আছে অতিরিক্ত মদ বা এলকোহল পান জনিত হেপাটাইটিস। এছাড়া সাম্প্রতিক কালের বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসা ফ্যাটি লিভার, লিভারের সিরোসিসের অন্যতম কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। আমাদের দেশে সিরোসিসের দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসাবে এটি দায়ী বলে ধারনা করা হচ্ছে। ডায়াবেটিস, রক্তের চর্বির উচ্চমাত্রা প্রভৃতি কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মত লিভারেও ফ্যাট জমে ফ্যাটি লিভার হয়।
এছাড়া ব্যাকটেরিয়া এবং প্যারাসাইট লিভারে এ্যাবসেস বা ফোঁড়া তৈরী করতে পারে। সর্বোপুরি প্রাণঘাতি ক্যান্সার ও ভর করতে পারে লিভারে। সিরোসিস যাদের হয় তাদের এ ক্যান্সার হওয়ার প্রবনতা সবচেয়ে বেশি।
হেপাটাইটিস ভাইরাস কিভাবে ছড়ায়ঃ
দুষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে হেপাটাইটিস এ ও ই ছড়ায়। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও বড়দের জন্ডিস এর প্রধান কারণ হেপাটাইটিস ই ভাইরাস। ঘরের বাহিরে-আমরা যখন থাকি, তখন খোলা খাবার, পানি, ফলের রস ইত্যাদির উৎস ও বিশুদ্ধতা যাচাই না করে ক্ষেতে অভ্যস্ত অনেকেই। এতে আক্তান্ত হই জন্ডিসে। তাছাড়া শহরে পানি সরবরাহ লাইনে ভাইরাসের সংক্রমন হয়ে জন্ডিস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও নতুন কিছু নয়। তাই ফুটিয়ে পানি খাওয়া আর বেছে বুঝে খাবার খাওয়ার কোন বিকল্প নেই। এতে শুধু হেপাটাইটিস এ এবং ই নয় টাইফয়েড আর ডায়ারিয়ার মত আরো অনেক পানি বাহিত রোগ থেকে বাঁচা যাবে।
রক্ত ও ব্যক্তিগত অনৈতিক আচরনের মাধ্যমে ছড়ায় হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস। দুষিত রক্ত গ্রহণ বা দুষিত সিরিজ ব্যবহারের মাধ্যমে অনেকেই নিজের অজান্তে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। একই শেভিং রেজার, ব্লেড কিংবা খুর ব্যবহারের মাধ্যমে এ দুটি ভাইরাস ছড়াতে পারে। হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত মায়ের সন্তানের জন্মের পর পর বি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ৯০ ভাগ। তবে মায়ের দুধের মাধ্যমে বি ভাইরাস ছড়ায় না। সামাজিক মেলামেশা যেমন হ্যান্ডশেখ বা কোলাকোলি এবং রোগীর ব্যবহার্য সামগ্রী যেমন গ্লাস জামা কাপড় ইত্যাদির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় না।
কিভাবে বুঝবেন আপনার হেপাটাইটিস হয়েছে কি না?
একিউট হেপাটাইটিসে ক্ষুধামন্দা, শরীর ব্যাথা, বমির ভাব কিংবা বমি এবং কিছু দিনের মধ্যে প্রস্রাবের রং ও চোখ হলুদ বর্ন ধারন করে। এ সময় শরীরে চুলকানী দেখা দিতে পারে। জন্ডিস ক্রমে বেড়ে যেয়ে ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ক্রনিক হেপাটাইটিস বা সিরোসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে বেশির ভাগ রোগীর উপসর্গ থাকে না বললেই চলে। কেউ কেউ দুর্বলতা, অবসন্নতা বা ক্ষুধামন্দা অনুভব করতে পারে। হেপটাইটিস বি ও সি অনেকাংশই নিরাময় যোগ্য রোগ হলেও অ্যাডভ্যান্সড লিভার সিরোসিস অথবা লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত রোগী প্রায়ই কোন শারীরিক অসুবিধা অনুভব করে না। এসব রোগিদের পেটে পানি জমে পেট ফুলে যেতে পারে, রক্ত বমি বা কাল পায়খানা কিংবা অজ্ঞান হয়ে জীবন ঝুকির সম্মখিন হতে পারে। এ সময় শরীর জীর্ন শির্ন হয়ে যায়। আমাদের দেশে অনেকে বিদেশে যাওয়ার প্রক্কালে রক্ত পরীক্ষার সময়, কিংবা রক্ত দিতে গিয়ে বা ভ্যাকসিন দিতে গিয়ে অনেকেই হেপাটাইটিস বি ইনফ্যাকশনের কথা প্রথম জানতে পারেন।
লিভারের রোগ হলে কি করবেনঃ
লিভারের রোগীর কোন উপসর্গ দেখা দিলে বা সন্দেহ হলে অথবা আপনার শরিরে ভাইরাসের সংক্রমন নিশ্চিত হলে দেরী না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এক্ষেত্রে সব চেয়ে ভাল হয় লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ। তিনি আপনার রোগ নির্ণয় করে এর কারণ, রোগের জন্য সৃষ্ট জটিলতা এবং রোগের বর্তমান অবস্থা জেনে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও উপদেশ দিবেন। হেপাটাইটিস এ ও ই জনিত রোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভাল হয়ে যায়। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে জটিলতাও দেখা দিতে পারে। হেপাটাইটিস ই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৮% গর্ভবতী মা মারা যায়। যখন শেষ তিনমাসের সময় মা তীব্রভাবে হেপাটাইটিস ই প্রদাহে ভোগেন। অন্যদের ক্ষেত্রে জীবন সংহারী একিউট হেপাটিক ফেইলিউর নামক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই জন্ডিস কে কখনও অবহেলা করবেন না। ক্রনিক হেপাটাইটিসের জন্য দায়ী হেপাটাইটিস বি ও সি এর বিরুদ্ধে কার্যকর ঔষধ গুলির সবই এখন আমাদের দেশে পাওয়া যায়। তাই এ ক্ষেত্রেও হতাশ না হয়ে লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
লিভার রোগ প্রতিরোধে আপনার করণীয়ঃ
০ হেপাটাইটিস বি এর টীকা নিন
০ ঝুঁকিপূর্ণ আচারণ যেমন-অনিরাপদ যৌনতা, একই সুঁই বা সিরিন্‌জ বহুজনের ব্যবহার পরিহার করুন।
০ নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন ও ডিজপজেবল সুঁই ব্যবহার করুন। ব্লেড, রেজার, ব্রাশ; খুর বহু জনে ব্যবহার বন্ধ করুন।
০ শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রন করুন।
০ শাক সবজি ও ফলমূল বেশি করে খান আর চর্বি যুক্ত খাবার কম খান।
০ মদ্যপান ও অন্যান্য নেশা জাতীয় দ্রব্য পরিহার করুন।
০ বিশুদ্ধ পানি ও খাবার গ্রহন করুণ।
০ ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রনে রাখুন।
০ পরিস্কার পরিছন্ন থাকুন।
শেষ কথাঃ মানুষের দেহে লিভার মাত্র একটিই আছে এবং জীবন ধারনের জন্য এটি অপরিহার্য। তাই লিভারের অসুস্থতার ফলাফল ক্ষেত্র বিশেষে হতে পারে ব্যাপক ও ভয়াবহ। তবে লিভারের রোগ মানেই সব কিছু শেষ হয়ে যাওয়া নয়। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ন নিরাময় এবং অনিরাময় যোগ্য জটিলতা মুক্ত মোটামুটি স্বাভাবিক ভাবে জীবন নির্বাহ করা যায়।

বার্ধক্য রোধে হরমোনের ভূমিকা


হরমোন হচ্ছে শক্তিশালী কিছু কেমিক্যাল, যা আমাদের দেহের স্বাভাবিক কাজকর্ম বজায় রাখতে সহায়তা করে। আমাদের দেহে প্রাকৃতিকভাবেই হরমোন উৎপন্ন হয় এবং বিভিন্ন উপায়ে দেহে প্রভাব বিস্তার করে।
তবে কিছু কিছু হরমোনের মাত্রা বয়সকালে কমতে থাকে অথবা আমাদের দেহও পর্যাপ্ত হরমোন উৎপন্ন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। সেসব ক্ষেত্রে বাইরে থেকে হরমোন প্রয়োগ কতটুকু বিজ্ঞানসম্মত কিংবা ফলদায়ক সেটাই এখানে আলোচনার বিষয়।
বিশেষ কয়েকটি হরমোন যেমন­ DHEA, গ্রোথ হরমোন, টেসটোসটেরন, ইস্ট্রোজেন এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। যৌবন ধরে রাখার জন্য কিংবা বয়স পিছিয়ে দেয়ার জন্য বাইরে থেকে এগুলোর ব্যবহার কতটুকু ফলপ্রসূ অথবা এসব হরমোন আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কি না তা আজো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাস্তব কথা হচ্ছে, যাদের বেলায় সত্যিকারভাবেই হরমোনের ঘাটতি বা সম্পৃক্ততা রয়েছে তাদের বেলায় কিছুটা উপকারী হলেও এসব হরমোনের ব্যাপারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। সঠিক মাত্রায় প্রয়োগে দেহ সুস্থ থাকবে, কিন্তু ভুল মাত্রায় ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এবার দেহে প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত হরমোনের কার্যকারিতার সাথে কৃত্রিমভাবে প্রয়োগকৃত হরমোনের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করা যাক। দেহের অভ্যন্তরস্থ কোষগুলোর সমষ্টিতে গ্রন্থির সৃষ্টি এবং নালীবিহীন গ্রন্থি নিঃসৃত হরমোন রক্তে মিশ্রিত হয়ে এবং বাহিত হয়ে দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাজ করে, কিন্তু কৃত্রিমভাবে দেহে নিসৃত হরমোনের মতো নয়। কারণ দেহে হরমোন বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় নিঃসৃত হয়ে থাকে। আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে, প্রয়োগকৃত হরমোন দেহে বেশি মাত্রায় বিরাজ করতে পারে। ফলে নেগেটিভ প্রভাব দেখা দিতে পারে। এমনিক দেহের হরমোনও বিপরীতমুখী প্রভাব সৃষ্টি করে। তাই অল্পমাত্রার এসব রাসায়নিক যৌগ হরমোন তা দেহ থেকেই নিঃসৃত হোক অথবা বাইরে থেকে প্রয়োগ করা হোক না কেন এগুলোর ব্যাপক কার্যকারিতা রয়েছে।
প্রথমেই দেহের বৃদ্ধি সাধনকারী হরমোন গ্রোথ হরমোন নিয়ে আলোচনা করা যাক। কারো কারো মতে এই গ্রোথ হরমোন বার্ধক্যেও লক্ষণগুলো কমাতে ভূমিকা রাখে। যেমন মাংশপেশীর বৃদ্ধি এবং চর্বি কমানো এবং দেহে শক্তি ও ভালো লাগা এবং সুস্থ থাকার অনুভূতি সৃষ্টিতে এই হরমোন সহায়ক।
আমাদের মস্তিষ্কে অবস্থিত পিটুইটারি গ্রন্থিকে মাস্টার গ্লান্ড ও বলা হয়। তা থেকে নিঃসৃত গ্রোথ হরমোন আমাদের দেহের টিস্যু অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক বৃষ্টি ও পরিপূর্ণতা নিয়ন্ত্রণের জন্য অতীব জরুরি। বিশেষ করে শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই গ্রোথ হরমোন বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এর মাত্রা কমে যেতে থাকে।
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে বাইরে থেকে প্রয়োগকৃত এই হরমোন ব্যক্তিবিশেষ উপকার নিয়ে আসতে পারে। অনেক সময় শিশুরা অস্বাভাবিকভাবে খাটো হতে পারে যদি তাদের শরীরে এই হরমোন সঠিকভাবে তেরি না হয়। এসব ক্ষেত্রে বাইরে থেকে প্রয়োগ করলে তা দৈহিক বৃদ্ধি ঘটবে। অন্য দিকে তরুণ বয়সে যদি গ্রোথ হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী পিটুইটারি গ্রন্থি কোন কারণে তা টিউমারের জন্য অথবা অন্য কোন অপারেশনের ফলে ফেলে দিতে হয় তাহলে এই হরমোন আর তৈরি হয় না এবং এসব ক্ষেত্রে মেদবহুল দেহের সৃষ্টি হয়। এসব রোগীর ক্ষেত্রে বাইরে থেকে হরমোন প্রয়াগে ওজন কমে যাবে।

এখনো রীতিমত গবেষণা হচ্ছে যে, এই গ্রোথ হরমোন বৃদ্ধ বয়সে প্রয়োগের ফলে এ সমযে তাদের মাংশপেশি শক্তিশালী ও দেহের চর্বি কমানো যায় কি না। এই ধরনের গবেষণায় রোগীদেরকে আরো বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে রেখে দেখা হয়েছে যে, এই বয়সে এই হরমোন প্রয়োগে কী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। পাশ্বৃপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিস রোগ্‌ ত্বকে ও টিস্যুতে পানি টেনে নিয়ে আসাতে ব্লাড ক্যান্সার বেড়ে যেতে পারে এবং হার্ট ফেল্যুউর হতে পারে, অস্থিসন্ধিতে ব্যথা ও হতে পারে। যদিও বিদেশে বহু লোক বার্ধক্য ঠেকাতে অঢেল অর্থ অপচয় করছেন, দেহে বাইরে থেকে হরমোন প্রয়োগ করছেন কিন্তু ফলাফল খুব আশাপ্রদ নয়।
এবারে টেসটোসটেরন হরমোন প্রসঙ্গে আলোচনা করা যাক। টেসটোসটেরন হরমোন পুরুষ হরমোন হলেও নারী-পুরুষ উভয়ের দেহে টেসটোসটেরন উৎপাদিত হয়। পুরুষদের দেহে টেসটোসটেরন মাত্রা বেশি হওয়াতে পুরুষালী লক্ষণ যেমন কণ্ঠস্বর ভরাট, দাঁড়ি-গোঁফ গজানো এবং মাংশপেশির প্রশস্ততা ইত্যাদি দেখা দেয়। এই টেসটোসটেরন হরমোন পুরুষদের যৌন অনুভূতি ও চেতনা ও পুরুষাঙ্গের উত্থান ক্ষমতায় বিশেষ কার্যকারী ভূমিকা পালন করে।
বার্ধক্যে টেসটোসটেরন মাত্রা কমে যেতে পারে। তবে বার্ধক্যে যে যৌন দুর্বলতা দেখা দিয়ে থাকে তার সবগুলোর কারণই কিন্তু টেসটোসটেরন কমে যাওয়ার জন্য নয়। যেমন কিছু ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস রোগ, রক্তনালীর সমস্যা ইত্যাদি আরো কিছু কারণ রয়েছে।
ওষুধ হিসেবে টেসটোসটেরন ব্যবহার হয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই তবে ব্যবহারের যৌক্তিকতা তাদের জন্যই হওয়া উচিত যাদের দেহে টেসটোসটেরন মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম রয়েছে অথবা যাদের দেহে পর্যাপ্ত পরিমাণে হরমোন তৈরি হচ্ছে না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, যাদের দেহের মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গেছে। তা টিউমার অথবা ইনফেকশনের কারণে হতে পারে অথবা টেসটোসটেরন উৎপাদনকারী অণ্ডকোষ কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অথবা অসুস্থ থাকার কারণেও হতে পারে।

যাদের সত্যিকারভাবেই টেসটোসটেরন মাত্রা অপূর্ণতায় রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে বাইরে থেকে প্রয়োগকৃত টেসটোসটের ওষুধের অনেক উপকারিতা ও কার্যকারিতা রয়েছে। এই হরমোনের অভাবে পুরুষদের মাংশপেশি ও হাড় দিন দিন দুর্বল হয়ে যেতে পারে। সেই সাথে শুধু এই হরমোনের অভাবে ও স্বল্পতায় যৌন উদ্দীপনা ও আগ্রহ ও ক্ষতা, বিশেষ করে পুরুষাঙ্গের উত্থান ক্ষমতা কমে যেতে পারে। বাইরে থেকে প্রয়োগকৃত হরমোন ব্যবহারে এই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠা সম্ভব। কারণ এর ফলে হরমোনের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখা যায়। তবে সব কিছুরই অতিরিক্ত প্রয়োগ ও ব্যবহার ক্ষতিকর। টেসটোসটেরনের প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা থাকার পরেও এর অতিরিক্ত স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ও টেসটোসটেরন হরমোনের ব্যবহার মাংশপেশির বৃদ্ধি ও শক্তি বৃদ্ধি ঘটাতে গিয়ে বিতর্কিত ঘটনার অবতারণা হয়েছে।
তাদের বেলায় দেখা গেছে যে, এদের বেশিরভাগই লোকেরই টেসটোসটেরন হরমোন মাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে এবং বাইরে থেকে প্রয়োগের ফলে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দেখা যাবে যে, প্রস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে গেছে, দেহের চর্বি কোলেস্টরলের মাত্রা বেড়ে গিয়ে পরবর্তীতে হৃদরোগের সৃষ্টি করতে পারে। বন্ধ্যাত্ব ও ব্রণ সমস্যারও বৃদ্ধি ঘটাতে পারে। যদিও এটা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি যে, বাইরে থেকে অতিরিক্ত টেসটোসটেরন হরমোন প্রয়োগের ফলে প্রস্টেট গ্রন্থির ক্যান্সার হতে পারে কি না।
তাই পরিশেষে বলতে চাই যে, বার্ধক্য রোধে নিজ থেকে হরমোন প্রয়োগ করা ঠিক নয় অনেক সময় দেখা যায় যে, আমাদের দেশে হাতুড়ে ডাক্তার অথবা যারা ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রি করেন অথবা সাধারণ এমবিবিএস ডাক্তারও তাদের প্রাত্যহিক প্রাকটিস জীবনে যৌন সমস্যা দেখা দিলে যথাযথ হরমোন পরীক্ষা না করে সরাসরি হরমোনের ওষুধ ব্যবহারের কথা বলে থাকেন অথবা ব্যবস্থাপত্র লিখে থাকেন। এটা কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বার্ধক্যের সব যৌন সমস্যা বা যৌন দুর্বলতার কারণই হরমোনজনিত নয়। কাজেই এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে চিকিসা ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। আপনার চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন যে বার্ধক্যে আপনার হরমোন গ্রহণ কতটুকু প্রয়োজন ও কতটুকু এর উপকারিতা রয়েছে।

সুগার এবং ডায়াবেটিস


সাধারণ এই স্বাস্থ্য সমস্যা ডায়াবেটিস হলে রক্তে বেড়ে যায় শর্করার মান। কখন হয় ডায়েবেটিস? অগ্নাশয় নষ্ট হয়ে শরীর যখন ইনসুলিন উৎপাদন করতে পারে না তখন হতে পারে ডায়েবেটিস। একে বলে টাইপ ১ ডায়েবেটিস। আবার শরীরের কোষগুলো যদি ইনসুলিন ব্যবহার করতে অক্ষম হয় এবং অগ্নাশয় ও কম ইনসুলিন উৎপাদন করে, তখনো হতে পারে ডায়েবেটিস। একে বলা হয় টাইপ ২ ডায়েবেটিস। আগে টাইপ ১ ডায়েবেটিসকে বলা হয় তরুণকালীন ডায়েবেটিস এবং টাইপ ২ ডায়েবেটিসকে বলা হত বয়স্কলোকের ডায়েবেটিস। এখন দেখা গেছে, বয়স নির্বিচারে যে কোনো রকমের ডায়েবেটিস হতে পারে। সেজন্য তরুণ ডায়েবেটিস বা বয়স্কদের ডায়েবেটিস নামগুলোর আর প্রচলন থাকছে না। টাইপ-১ ডায়েবেটিসকে ইনসুলিন নির্ভর এবং টাইপ-২ ডায়েবেটিসকে ইনসুলিন-অনির্ভর ডায়েবেটিস বলা হচ্ছে। অবশ্য টাইপ-২ ডায়েবেটিসেও ক্ষেত্র ও অবস্থা বিশেষে ইনসুলিন প্রয়োগ করতে হয়।

ডায়েবেটিসের সচরাচর দৃষ্ট যেসব জটিলতা সেগুলো হলঃ চোখের ক্ষতি, স্নায়ুরোগ, কিডনির সমস্যা, অবশ্য হার্টএটাক, স্ট্রোক, হাড় ও পেশীরোগ এবং সংক্রমণের মত সমস্যা ও পুনঃপুনঃ হতে পারে, রোগ জটিল হলে। চিকিৎসা হলে এক সঠিক সময়ে ব্যবস্থাপনা করলে এসব জটিলতা ঘটানো দেরী করানো যায় এমনকি রোধও করা যায়।

কি কারণে হতে পারে ডায়েবেটিস?
ব্যক্তি বিশেষে ডায়েবেটিস কেন হয়, তা অজানা, তবে আছে নানা মত এ ব্যাপারে। গবেষণা চলছে, কি করে এই রোগ হয় তা জানার জন্য। আছে কিছু ঝুঁকি উপাদান, যেমন-
-বংশগতি।
-মেদস্থূলতা।
-ওষুধ।
-ভাইরাস সংক্রমণ।
বর্তমানে বলা হচ্ছে যেসব খাদ্যের গ্লাইসিমিক ইনডেক্স খুব উঁচু, এসব খাদ্য বেশি বেশি খেলে পরিণতিতে হতে পারে ডায়েবেটিস। যেসব খাবার খাওয়ার পর পরই অন্য খাবারের তুলনায় অনেক দ্রুত রক্তের সুগার মান বাড়িয়ে দেয় সেসব খাবারের গস্নাইসিমিক ইনডেক্স উঁচু এমন বলা হয়। তবে এও ঠিক অনেক মানুষ এসব খাবার আকচার খাচ্ছে তবে তাদের ডায়েবেটিস হচ্ছে না।
সুগার ও ডায়েবেটিস
ডায়েবেটিস আছে এমন এক রোগীর জন্য পরামর্শ হল, যেসব খাবারে সুগার বেশি সেসব খাবার পরিহার করা এবং এমন খাদ্যবিধি ও ওষুধবিধি মেনে চলা যাতে রক্তের শর্করা মান থাকে স্বাভাবিক ও সুস্থিত। রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ ভালোভাবে করলে রোগটির জটিলতা অনেক এড়ানো সম্ভব। রোগটির মূল বৈশিষ্ট্য যেহেতু রক্তের সুগার মানের বৃদ্ধি এবং যেহেতু উঁচুমান সুগারকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নামিয়ে আনাই হলো চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য, সেজন্য খাদ্যের শর্করা পরিমাণ এককভাবে এ রোগের জন্য দায়ী নয়।
রক্তে সুগার মান বেড়ে যাওয়া হলো ডায়েবেটিসের পরিণতি, কারণ নয়।
নিউমোনিয়ার কারণ যেমন কফ-কাশ হয়, তেমনি রক্তে সুগার মান বৃদ্ধি ও ডায়েবেটিসের কারণ নয়, পরিণতি মাত্র।
আর একটি কথাঃ এ কথা ঠিক টাইপ-২ ডায়েবেটিস বোধ করতে মেদস্থূলতা এড়ানো প্রয়োজন তবে এজন্য বিশেষ বিশেষ খাদ্য খেলে তা এড়ানো যাবে এমনও নয়। আর সব ডায়েবেটিস রোগী স্থূল একথাও ঠিক নয়। এসব রোগীর ক্ষেত্রে বংশগতি এবং অনাবিষ্কৃত অনেক উপাদান দায়ী থাকতে পারে।
শেষ কথাঃ
দেহের ওজন সুমিত রাখা ছাড়া ডায়েবেটিস প্রতিরোধে খাদ্যবিধি বা অন্য উপায় যে খুব সফল তা নয়। এই রোগ বিকাশের পেছনে যে জীনগত, ইম্যুন ব্যবস্থাজনিত বা অন্যান্য পরিবেশগত উপাদান রয়েছে সেসব সনাক্ত করার জন্য চলছে গবেষণা, বিশেষ করে যেসব লোকের ঝুঁকি বেশি এদের ক্ষেত্রে এ রোগ প্রতিরোধ বেশি জরুরী। তবে সুগার সমৃদ্ধ খাবার বেশি খেলে ডায়েবেটিস হয় এ তথ্যটি অবশ্যই সঠিক নয়।
২৮ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে ডায়েবেটিস সচেতনতা দিবস। এ দিন জাতীয় অধ্যাপক মোঃ ইব্রাহীম অন্যান্যদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ডায়েবেটিক সমিতি। এ দিনটি স্মরণীয় এজন্য যে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এ দেশে সেদিন সূচিত হয়েছিল একটি নতুন মাইলফলক।

হাঁপানি নিয়ন্ত্রণের কলাকৌশল


গতকাল ৬ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হলো বিশ্ব হাঁপানি দিবস ২০০৮। গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর অ্যাজমা (জিআইএনএ) প্রতিবছর এ দিবস পালনের আয়োজন করে থাকে। উদ্দেশ্য হলো, বিশ্বজুড়ে হাঁপানি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি ও এর পরিচর্যাকে জোরদার করা। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো-‘নিজের হাঁপানি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়’। বিশ্ব হাঁপানি দিবস উপলক্ষে স্বাস্থ্যকুশল-এর বিশেষ আয়োজন

অ্যাজমা বা হাঁপানি হলো শ্বাসনালির দীর্ঘস্থায়ী ও প্রদাহজনিত একটি রোগ। এ রোগটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত। বিশ্বের প্রায় ২০ কোটি লোক এতে আক্রান্ত। প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ লোক এ রোগে মৃত্যুবরণ করে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আমাদের দেশে ৭০ লাখ লোক এ রোগে ভুগছে। তাদের ৫০ শতাংশের বয়সই ১৫ বছরের নিচে। যদিও গত দুই দশকে অ্যাজমা রোগের চিকিৎসায় অনেক সাফল্য অর্জিত হয়েছে, এর প্রদুর্ভাব ও তীব্রতা এবং এ রোগের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি দিন দিন বেড়েই চলেছে। যদিও দারিদ্র্য, অশিক্ষা, পরিবেশদূষণ ও অপর্যাপ্ত চিকিৎসাব্যবস্থাকে দায়ী করা হয় কিন্তু রোগের সঠিক নির্ণয় না হওয়া, রোগের তীব্রতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না করা, অপর্যাপ্ত বা ভুল চিকিৎসা এবং চিকিৎসায় রোগীর অনীহা যথেষ্ট দায়ী। যদিও আপাতদৃষ্টিতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব উন্নত দেশেই বেশি, তবে জনসংখ্যার অনুপাতে এ রোগ আমাদের দেশেও কম নয়।

হাঁপানি কেন হয়
হাঁপানি যেকোনো বয়সের নারী বা পুরুষের হতে পারে। এটা শ্বাসনালির একটা প্রদাহজনিত রোগ। সংক্রামক বা ছোঁয়াচে নয়। প্রদাহজনিত কারণে শ্বাসনালির সংবেদনশীলতা বেড়ে যায়। ফলে ঘন ঘন কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, আওয়াজ, বুকে চাপ বা দম নিতে কষ্ট হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যদি সঠিকভাবে উপযুক্ত চিকিৎসা না নেওয়া হয়, তাহলে এ রোগে অনেক সময় মৃত্যুও হতে পারে।

হাঁপানির সঠিক কারণ এখনো জানা যায়নি। এ রোগের জন্য কোনো কিছুকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, কারও কারও বংশগত কারণে বা পরিবেশগত কারণেও এ রোগ হতে পারে। কারও নিকটাত্মীয় যদি এতে আক্রান্ত থাকে বা কেউ যদি বিভিন্ন দ্রব্যের প্রতি অতিমাত্রায় অ্যালার্জিক হয় তাহলে তার হাঁপানি হতে পারে। এ ছাড়া শ্বাসনালি যদি অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়, এ রোগ হতে পারে।

এ ছাড়া ধুলোবালির মধ্যে থাকা মাইট নামের ক্ষুদ্র কীট, ফুলের পরাগরেণু থেকে; পশুপাখির পালক, ছত্রাক, মল্ট, ইস্ট, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সিগারেটের ধোঁয়ার মধ্যে যারা থাকে তাদের এ রোগ হতে পারে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সিগারেটের ধোঁয়া শুধু শ্বাসকষ্টের কারণই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটা হাঁপানির তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়। হাঁপানির ওষুধের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, কখনো কখনো ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী কার্যক্ষমতাও কমে যায়।
কখনো কখনো ব্যক্তির পেশাগত কারণেও এ রোগটি হতে পারে। কিছু উত্তেজক উপাদান বা ট্রিগার ফ্যাক্টর অনেক সময় সংবেদনশীল রোগীর শ্বাসকষ্ট শুরু করতে পারে-যেমন শ্বাসনালির সংক্রমণ, অ্যালার্জি-জাতীয় বস্তুর সংস্পর্শ, বায়ুদূষণ, সিগারেটের ধোঁয়ার কারণেও এটি হতে পারে। কোনো কোনো ড্রাগ, যেমন বিটা ব্লকার, যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয়, এনএসএআইডি (ব্যথা নিরাময়কারী ওষুধ) এসপিরিন কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাঁপানির কারণ হতে পারে।

এ ছাড়া মানসিক চাপে থাকলে হাঁপানির তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে। কোনো কোনো খাবারের প্রতি সংবেদনশীল বা চিংড়ি মাছ, হাঁসের ডিম, গরুর মাংস, বেগুন, পুঁইশাক, মিষ্টিকুমড়া, ইলিশ মাছ প্রভৃতি খেলে চুলকায়, নাক দিয়ে পানি পড়ে কারও কারও-অর্থাৎ অ্যালার্জি হয়। তবে খাবারের মাধ্যমে যে অ্যালার্জি হয় তাতে খুব কম লোকের অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। কারও কারও বিভিন্ন সুগন্ধি, মশার কয়েল বা কারও কারও কীটনাশকের গন্ধ থেকেও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যেতে পারে।

রোগ নির্ণয়
রোগ নির্ণয়ের প্রথম ধাপ হচ্ছে রোগীর মুখে রোগের বিস্তারিত ইতিহাস জানা।
হাঁপানির প্রধান উপসর্গগুলো হলো শ্বাসকষ্ট, কাশি, বুকের মধ্যে দপ দপ শব্দ হওয়া, বুকে চাপ অনুভব করা, বা অল্পতেই দম ফুরিয়ে যাওয়া। তবে কখনো কখনো দুবার অ্যাটাকের মধ্যে রোগীর হাঁপানির কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। অল্প যেকোনো একটি বা তারও বেশি উপসর্গ থাকতে পারে।

সাধারণত এ উপসর্গগুলো রাতে বা খুব সকালে বেশি হয় এবং শ্বাসনালিতে কোনো ধরনের অ্যালজেন প্রবাহ প্রবেশ করলে বা অল্পমাত্রায় পরিবর্তন হলে এ উপসর্গের তীব্রতা বেড়ে যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে কাশি বা শ্বাসকষ্ট শুরুর আগে নাক চুলকায়, হাঁচি হয়, নাক দিয়ে পানি পড়ে, চোখ লাল হয়ে যায়। ওপরের উপসর্গগুলোর সঙ্গে বংশে কারও যদি হাঁপানিতে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস থাকে, তাহলে ধরে নেওয়া যায় তার হাঁপানি রয়েছে।
হাঁপানি নির্ণয়ে সহায়ক পরীক্ষা

?? লাং ফাংশন টেস্ট বা স্পাইরোমেট্রি, যা দিয়ে শ্বাসনালির কতটুকু সরু হয়েছে তা বোঝা যায়।
?? কফের মধ্যে থাকা ইয়োসোনোফিলের সংখ্যা থেকে বোঝা যায়, শ্বাসনালিতে কোনো ক্ষত হয়েছে কি না।
?? কখনো কখনো স্কিন অ্যালার্জি পরীক্ষা করে কোন বিশেষ উত্তেজক জিনিস হাঁপানির জন্য দায়ী তা শনাক্ত করা হয়।
?? পিক ফ্লো মিটার পরীক্ষাঃ রোগী কত তাড়াতাড়ি ও কত জোরে ফুঁ দিতে পারে সেটি এ যন্ত্রের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায়। শ্বাসনালি সরু হলে পিক ফ্লো কমে যায়। হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা এ যন্ত্রের সাহায্যে পরিমাপ করা যায়।

চিকিৎসা
হাঁপানি সম্পূর্ণ নিরাময়ের জন্য এখনো কোনো ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। তবে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। হাঁপানি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগী পুরো সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত হাঁপানি হার্ট-অ্যাটাকের মতোই ভয়াবহ। এতে মৃত্যুও হতে পারে।

হাঁপানি নিয়ন্ত্রণের একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো সতর্কভাবে খেয়াল রাখা, কোন কোন উপসর্গে রোগীর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় তা নির্ণয় করা এবং তা থেকে দূরে থাকা। কারণ সব হাঁপানি রোগীর রোগের উপসর্গ কমা বা বাড়ার জন্য একই উত্তেজক বা ট্রিগার ফ্যাক্টর দায়ী নয়। এ ছাড়া অনেক সময় পরিবেশের ওপর মানুষের কোনো হাত থাকে না। অনেক সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপরও আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। বাজারে হাঁপানির যেসব ওষুধ পাওয়া যায় তা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব।

ওষুধ-পথ্য
হাঁপানির চিকিৎসায় প্রধানত দুই ধরনের ওষুধ ব্যবহৃত হয়।
?? উপশমকারী ওষুধ বা রিলিভার এবং
?? রোগ নিরাময় বা প্রতিরোধকারী ওষুধ।

উপশমকারী ওষুধের আরেক নাম হলো ব্রংকোডায়ালেটর, যা সরু শ্বাসনালির পথ প্রসারিত করে তাৎক্ষণিকভাবে শ্বাসকষ্ট কমিয়ে দেয়। যেহেতু এটি শ্বাসনালির প্রদাহ বা ক্ষত সারাতে সাহায্য করে না, তাই এটি নিয়মিত অবিরাম ব্যবহার করা উচিত নয়। শুধু প্রয়োজন হলেই ব্যবহার করা উচিত। বাজারে বিভিন্ন নামে ও বিভিন্ন আকারে এটি পাওয়া যায়। ইনহেলার বা ট্যাবলেট হিসেবে পাওয়া যায়। যেমন ভেনটোলিন, সালটোলিন, অ্যাজমাসোল, সালমোলিন ও সেলোমেন্স। নিরাময়কারী ওষুধ হলো স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ, যা অনেক সময় জীবন বাঁচায়। এটা অ্যালার্জিনাশক ও প্রদাহবিরোধী। স্টেরয়েড ইনহেলার শ্বাসনালির প্রদাহ কমিয়ে শ্বাসনালির সংবেদনশীলতা কমায়। স্টেরয়েড এমন একটা ওষুধ, যার পরিমিত ব্যবহারে হাঁপানি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

অন্যদিকে এর অপরিমিত ব্যবহার হলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে ক্ষতিকর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই ইনহেলারের মাধ্যমে চিকিৎসা করলে যথাযথ ইনহেলার ব্যবহার করবেন এবং এর সঠিক মাত্রা জেনে ব্যবহার করবেন। কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি ব্যবহার করবেন না। বাজারে বিভিন্ন ধরনের স্টেরয়েড ইনহেলার পাওয়া যায়, যেমন সেরেটাইড ইভোহেলার বা ইকোহেলার, বেক্সিটোন এফ, টিকামেট প্রভৃতি।

হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে রোগীর ভূমিকা
হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে রোগীর ভূমিকাও কম নয়। রোগীকে জানতে হবে তার রোগটির প্রকৃতি কী, এর চিকিৎসা কী, তিনি ইনহেলার ব্যবহার করবেন কি না, ইনহেলারের কাজ কী প্রভৃতি। গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিকভাবে ইনহেলার ব্যবহার করতে জানা। রোগীকে জানতে হবে কী চিকিৎসা তার প্রয়োজন, তার হাঁপানির উপসর্গ কখন বাড়ে, কখন ইনহেলার ব্যবহার করবে, কখন রোগটি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং কখন রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ নেবে।

হাঁপানি নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা
পাশের বক্সটি হাঁপানি রোগীদের (১২ বছর বা এর চেয়ে বেশি বয়সের) হাঁপানি নিয়ন্ত্রণের অবস্থা মূল্যায়নে সাহায্য করতে পারে। প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তরের ডান পাশের নম্বরের ওপর টিকচিহ্ন দিন। পাঁচটি প্রশ্নের উত্তরের জন্য প্রাপ্ত নম্বর যোগ করে আপনি আপনার হাঁপানি নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষার মোট নম্বর আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করতে ভুলবেন না। আপনার নম্বর কী অর্থ বহন করে তা জানার জন্য স্কোর মিলিয়ে দেখুন।

আপনার হাঁপানির মাত্রা জানুন
প্রথম ধাপঃ প্রতিটি প্রশ্নের জন্য আপনার প্রাপ্ত নম্বরের ওপর একটি টিক চিহ্ন দিন এবং ডান পাশের ঘরে নম্বরটি লিখুন। অনুগ্রহ করে যতটা সম্ভব সঠিক উত্তর দিন। এটি আপনাকে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে হাঁপানি বিষয়ে আলোচনায় সাহায্য করবে।
প্রশ্ন-১:  গত চার সপ্তাহে আপনার হাঁপানি আপনাকে কী পরিমাণ সময় কর্মক্ষেত্রে, স্কুলে বা বাসায় স্বাভাবিক কাজকর্ম করা থেকে বিরত রেখেছে?
সব সময় (১) বেশির ভাগ সময় (২) কিছু সময় (৩) অল্প কিছু সময় (৪) কখনোই নয় (৫)
প্রশ্ন-২:  গত চার সপ্তাহে কত ঘন ঘন আপনার শ্বাসকষ্ট হয়েছে?
দিনে একবারের বেশি (১) দিনে একবার (২) সপ্তাহে তিন থেকে ছয়বার (৩) সপ্তাহে এক বা দুবার (৪) কখনোই নয় (৫)
প্রশ্ন-৩:  গত চার সপ্তাহে আপনার হাঁপানির উপসর্গ (ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস গ্রহণ, কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে আড়ষ্টতা বা ব্যথা) কত ঘন ঘন আপনাকে রাতে বা সকালে নিয়মিত সময়ের আগে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়েছে?
সপ্তাহে চার রাত বা বেশি (১) সপ্তাহে দুই থেকে তিন রাত (২) সপ্তাহে একবার (৩) এক বা দুবার (৪) কখনোই নয় (৫)
প্রশ্ন-৪:  গত চার সপ্তাহে কত ঘন ঘন আপনি দ্রুত উপশমকারী ইনহেলার ব্যবহার করেছেন, যেমন স্যালবিউটামল অথবা টারবিউটালিন?
দিনে তিনবার বা তার চেয়ে বেশি (১) দিনে এক বা দুবার (২) সপ্তাহে দুই বা তিনবার (৩) সপ্তাহে এক বা তার চেয়ে কম (৪) কখনোই নয় (৫)
প্রশ্ন-৫:  গত চার সপ্তাহে আপনি কীভাবে আপনার হাঁপানি নিয়ন্ত্রণকে মূল্যায়ন করবেন?
একেবারেই নিয়ন্ত্রণ নয় (১) দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রণ (২) কিছুটা নিয়ন্ত্রণ (৩) ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ (৪) সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ (৫) নম্বর
দ্বিতীয় ধাপঃ আপনার মোট নম্বর জানার জন্য আপনার প্রাপ্ত সব নম্বর যোগ করুন।
তৃতীয় ধাপঃ আপনার নম্বর কী অর্থ বহন করে তা জানার জন্য নিচে দেখুন।
নম্বরঃ ২৫-আপনাকে অভিনন্দন
গত চার সপ্তাহে আপনার হাঁপানি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। আপনার হাঁপানির কোনো লক্ষণ ছিল না এবং হাঁপানিসংক্রান্ত কোনো সীমাবদ্ধতা ছিল না। এ অবস্থার পরিবর্তন হলে আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করুন।
নম্বরঃ ২০ থেকে ২৪-আপনি ভালো করেছেন
গত চার সপ্তাহে আপনার হাঁপানি হয়তো ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে ছিল কিন্তু সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল না। হাঁপানি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আপনার চিকিৎসক হয়তো আপনাকে সাহায্য করতে সক্ষম হতে পারেন।
নম্বরঃ ২০-এর কম-আপনি ভালো করতে পারছেন না
গত চার সপ্তাহে আপনার হাঁপানি হয়তো ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল না। হাঁপানির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে আপনাকে সাহায্য করার জন্য আপনার চিকিৎসক একটি হাঁপানি নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা প্রদান করতে পারেন।
তথ্যসূত্রঃ বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন ও অ্যাজমা অ্যাসোসিয়েশন
 

ব্রণের সমস্যা ও চিকিৎসা

সাধারণত ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের ক্ষেত্রে ব্রণ একটি সাধারণ অসুখ। তবে যে কোনো বয়সেই ব্রণ হতে পারে।

ব্রণ দেখতে বিভিন্ন রকম হতে পারে। যেন ছোট ছোট গোল ফুসকুড়ি, লালচে ছোট ছোট গোটা, আবার পুঁজপুর্ণ বড় বড় চাকাও হতে পারে। ব্রণ টিপলে ভাতের দানার মতো বের হয়ে আসে। অনেকের ব্রণ খুব যন্ত্রণাদায়ক হয়। ব্রণের ফলে ত্বকে ছিদ্র দেখা দিতে পারে। কারো কারো মুখে ব্রণের তীব্রতা বেশি থাকলে তা এবড়োখেবড়ো দেখায়। ব্রণ বেশি টেপটিপি করলে সেখানে কালো দাগ সৃষ্টি হয়। ব্রণের চিকিৎসায় কতজনের কত না আয়োজন। অনেকে অনেক কসমেটিকের বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে তা ব্যবহারও করে থাকে এবং দেখা যায় এসব কসমেটিকস প্রকৃতপক্ষে বাড়িয়ে তুলছে ব্রণের তীব্রতা।

ব্রণ কেন হয়? আমাদের ত্বকে অনেকগুলো ‘সিবাসিয়াস গ্রন্হি’ থাকে, যা থেকে সবসময় ‘সিবাম’ নামক এক ধরনের তৈলাক্ত রস নিঃসৃত হয়। লোমকুপ দিয়ে এই সিবাম বের হয়ে ত্বকে ছড়িয়ে পড়ে বিধায় ত্বকে নরম, মসৃণ ও তৈলাক্ত ভাব আসে। যদি কোনো কারণে ‘সিবাম’-এর নিঃসরণ বৃদ্ধি পায় এবং লোমের গোড়ায় বিদ্যমান ‘কেরাটিন’ (এক ধরনের প্রোটিন জাতীয় পদার্থ) ধুলোবালির সঙ্গে মিশে সেখানকার ছিদ্রপথ বা নির্গমণের পথ বন্ধ করে দেয়। ফলে সিবাম বের হতে না পেরে জমা হয়ে ব্রণ হিসেবে প্রকাশ পায়। 

ব্রণের চিকিৎসা
ষ সব ধরনের প্রসাধনী বর্জন করতে হবে। নখ দিয়ে ব্রণ খোঁটাখুঁটি করা যাবে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্রণ আপনা-আপনি সেরে যায়।

ষ দিনে অন্তত তিনবার ‘নিউট্রাজিনা’ সাবান দিয়ে মুখ ধুতে হবে। অনেকে ব্রণ হলে মুখে সাবান ব্যবহার বন্ধ করে দেন অথচ এ সময়ে সাবান দিয়ে মুখ ধুলে উপকার হয়, কেননা সাবান মুখের তৈলাক্ততা দুর করে এবং লোমকুপ পরিষ্কার রাখে। 

ষ রাতে ঘুমানোর সময় ভালো করে মুখ ধুয়ে শুধু ব্রণগুলোর ওপর পেনক্সিল ২.৫% জেলটি লাগানো যেতে পারে। এটি ব্যবহারে অনেকের চুলকানি বা লালাভ হতে পারে, তবে দু-একদিন জেলটি ব্যবহারের পর ঠিক হয়ে যায়। চুলকানি বা লাল ভাব বেশি হলে ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে। 

ষ কোষ্ঠকাঠিন্য থাকলে তা দুর করতে হবে। ঝাল-মসলাযুক্ত ও তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। সুষম সহজপাচ্য হালকা খাবার, শাকসবজি, ফলমুল এবং প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। পুষ্টিহীনতায় ভুগলে প্রোটিন ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। 

ষ মাথায় খুশকি থাকলে অ্যান্টিড্যানড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহার করে খুশকি দুর করতে হবে। ব্রণের তীব্রতা বেশি হলে চিকিৎসকের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করতে হবে। 

কম ঘুম মহিলাদের ব্লাড প্রেশার বাড়ায়


সারদিনের খাটুনির পর রাতের ঘুম দেয় প্রশান্তি। দূর করে সব ক্লান্তি। দেয় পরদিন নতুন উদ্যেমে কাজ করার শক্তি। কিন্তু ঘুমটি হওয়া চাই নির্বিঘ্ন ও অবশ্যই পর্যাপ্ত। ঘুম যদি পর্যাপ্ত না হয় তাহলে তা শরীরের ওপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অপর্যাপ্ত ঘুম নিরবে শরীরের নানা ক্ষতি করে। সম্প্রতি একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন অপর্যাপ্ত ঘুম কীভাবে মহিলাদের ব্লাড প্রেশার বা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা যায় যেসব মহিলা দিনে সাত ঘন্টারও কম ঘুমায় তাদের উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
যুক্তরাজ্যের গবেষকরা ১০ হাজারেরও বেশি পুরুষ ও মহিলার ওপর পাঁচ বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে দেখেন, যেসব মহিলা দিনে ছয় ঘন্টা বা তারও কম ঘুমিয়েছে তারা অন্যদের তুলনায় বেশি উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়েছে। যেসব মহিলা রাতে সাত ঘন্টা করে ঘুমিয়েছে তাদের তুলনায় যারা ছয় ঘন্টা করে ঘুমিয়েছে তাদের উচ্চ রক্তচাপে ভোগার সম্ভাবনা ৪২ শতাংশ বেশি বলে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন।
তবে গবেষকরা পুরুষদের ক্ষেত্রে কম ঘুমের সাথে উচ্চ রক্তচাপের সর্ম্পক খুঁজে পাননি। যুক্তরাজ্যের কেভেন্টি’র ওয়ারউইক মেডিক্যাল স্কুল-এর ডক্টর ফ্রান্সিসকো পি• ক্যাপসিও-এর নেতৃত্ব গবেষকরা ১০ হাজার ৩০০ জনের ওপর দীর্ঘমেয়াদী এ গবেষণা চালান। তখন ঐ ব্যক্তিদের বয়স ছিল ৩৫ থেকে ৫৫ বছর। গবেষণা শেষে দেখা যায় ঐ ব্যাক্তিদের ২০ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়েছে এবং তাদের বেশির ভাগই সেইসব মহিলা যারা কম ঘুমিয়েছে।
গবেষকরা ধারণা করছেন অপর্যাপ্ত ঘুম স্নায়ুতন্ত্রকে অতিমাত্রায় সক্রিয় রাখে যা হার্ট ও রক্তনালীসহ সারা শরীরেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

ডায়রিয়া প্রতিরোধে করণীয়


প্রতি বছরই এ সময়টায় ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এবারো তা-ই হয়েছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হাসপাতালের আঙ্গিনায় অস্হায়ী ক্যাম্প করে রোগী ভর্তি করা হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত মতো নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য হাসপাতালেও রোগী ভর্তি হচ্ছে। এসব রোগীর অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণীর। তাদের পক্ষে সবসময় বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করা সম্ভবও হয় না। পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, ঢাকা শহরের অনেক অঞ্চলে ওয়াসার পানিতেও ময়লা ও দুর্গন্ধ থাকে। তদুপরি উৎপাদনের ঘাটতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অন্যান্য কারণে ওয়াসার পানির সরবরাহও সবসময় থাকে না। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা পানি ভালোভাবে ফুটিয়ে পান করার জন্য পরামর্শ দেন।
কিন্তু দরিদ্র মানুষের পক্ষে অনেক সময় ফুটানো পানি পান করাও সম্ভব হয় না। প্রচন্ড গরমে তৃষ্ণার্ত অবস্হায় তারা রাস্তাঘাটের দোকান বা হোটেল-রেস্তোরাঁয় গিয়ে পানি পান করে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব পানি জীবাণুযুক্ত থাকে। শুধু বিশুদ্ধ পানি পান করাই নয়, খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত পানিও বিশুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। রাস্তাঘাটে শরবত ও অন্যান্য খাবারে ব্যবহৃত পানিও সাধারণত বিশুদ্ধ হয় না। খাওয়ার আগে হাত ও থালাবাসন ভালো করে বিশুদ্ধ পানিতে ধোয়া, রাস্তাঘাটের খোলা খাবার না খাওয়া, পানি ফুটানো না গেলে বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বা ফিটকিরি দিয়ে বিশুদ্ধ করে নেয়াসহ ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা খুবই জরুরি। কেউ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ হচ্ছে, দ্রুত তাকে খাওয়ার স্যালাইন দিতে হবে, যাতে শরীরে পানিশুন্যতা সৃষ্টি না হয়। একইসঙ্গে স্বাভাবিক খাবার খেতে দিতে হবে। তারপরও পাতলা পায়খানা বন্ধ না হলে কিংবা রোগীর অবস্হা খারাপ হতে থাকলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ডায়রিয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রধান উপায় হলো, সবসময় বিশুদ্ধ পানি পান ও ব্যবহার করা। ওয়াসার পানিতে ময়লা থাকা রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতারই পরিচয় বহন করে।

উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করুন


উচ্চ রক্তচাপ কি?
উচ্চ রক্তচাপ বিশ্বে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। সারা বিশ্বে ১৫০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিডনী রোগের জন্য উচ্চ রক্তচাপ একটা গুরুত্বপূর্ণ রিস্ক ফ্যাক্টর বা ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান।
উচ্চ রক্তচাপ দিবসের উদ্দেশ্য
জনগণকে উচ্চ রক্তচাপ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জানানো, সচেতন করা, প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং এই রোগের জটিলতা এবং চিকিৎসা সম্পর্কে অবহিত করাই বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবসের উদ্দেশ্য। প্রতি বছর ১৭ মে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস উদযাপন করা হয়ে থাকে।
বাড়িতে কেন রক্তচাপ পরিমাপ করবেন?
বাড়িতে রক্তচাপ মাপার ফলে আপনি নিজে এবং আপনার চিকিৎসক আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত প্রতিদিনের একটি চিত্র পাবেন। এর ফলে জীবন-যাপনের পরিবর্তন এবং ওষুধ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কতখানি ভূমিকা রাখছে সেটা বোঝা যাবে। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পূর্বের এক সপ্তাহে প্রতিদিন দুই বার করে রক্তচাপ মাপা এবং রেকর্ড রাখা ভালো। আপনার প্রাত্যহিক জীবনে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে এই রেকর্ড বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
আপনার উচ্চ রক্তচাপ আছে কিনা সেটা জানার একমাত্র উপায় রক্তচাপ পরিমাপ করা। এজন্য বাসায় রক্তচাপ মাপুন।
রক্তচাপ পরিমাপের বেশিরভাগ আধুনিক যন্ত্রসমূহ স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটিক) অথবা আধা স্বয়ংক্রিয় (সেমি অটোমেটিক) হয়ে থাকে। নিজের রক্তচাপ নিজে মাপা সহজ এবং নিরাপদ। তবে যে সব মানুষ বেশি উদ্বিগ্ন এবং যাদের শারীরিক অক্ষমতা আছে, তাদের রক্তচাপ মাপতে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। এ সকল ক্ষেত্রে আপনি চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর সাহায্য নিতে পারেন।
উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করুন
রক্তচাপ পরিমাপের জন্য কি ধরনের যন্ত্র (মেশিন) ক্রয় করবেন?
রক্তচাপ পরিমাপের জন্য অনেক ধরনের মেশিন বের হয়েছে। চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে আপনার জন্য উপযুক্ত রক্তচাপ মাপার মেশিন এবং বাহুবন্ধনীর সাইজ নির্বাচন করুন।
০ ব্রান্ড কোম্পানীর লোগো দেখে সঠিক মেশিন কিনুন। যে সমস্ত মেশিনে এই দুটি লোগো আছে, সেগুলি কেনার চেষ্টা করুন।
০ অটোমেটিক মেশিন ব্যবহার করা সহজ, কিন্তু সেমি অটোমেটিক মেশিনের তুলনায় এই মেশিনের দাম বেশি।
০ রক্তচাপ মাপার বিভিন্ন সাইজের বাহুবন্ধনী পাওয়া যায়। বাহুতে যাতে বাহুবন্ধনী সঠিকভাবে লাগানো যায়, সেই দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাহুবন্ধনীর সাইজ সঠিক না হলে রক্তচাপের রিডিং যথার্থ হয় না। বাহুবন্ধনীর সঠিক সাইজ নির্বাচনের জন্য চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী কিংবা দোকানদারের সাহায্য নিন।
রক্তচাপ কিভাবে পরিমাপ করবেন
০ রক্তচাপ পরিমাপের পূর্বে পাঁচ মিনিট বিশ্রাম নিন এবং প্রশান্ত (রিলাক্স) থাকুন। এ সময় মনোযোগ সহকারে কোন কিছুতে নিবিষ্ট থাকবেন না (যেমন টিভি দেখা)।
০ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করলে, ঠান্ডা লাগলে, রাগাম্বিত হলে, কোন কিছুর চাপ বা টেনশনে থাকলে কিংবা ব্যথা অনুভূত হলে সেই সময় রক্তচাপ পরিমাপ করবেন না।
০ ভরপেট খাওয়ার পর অন্ততঃপক্ষে দুই ঘন্টা অপেক্ষা করুন এবং কফি বা ধূমপান করার পর আধা ঘন্টা অপেক্ষা করুন।
০ প্রস্রাব এবং পায়খানার বেগ থাকলে রক্তচাপ মাপার পূর্বে তা সেরে ফেলুন।
০ অনাবৃত বাহুতে বাহুবন্ধনী জড়ান।
০ এমন চেয়ারে বসুন, যাতে আপনি হেলান দিয়ে বসতে পারেন এবং বাহু রাখার জন্য সাইড টেবিল ব্যবহার করুন (চিত্র দেখুন)।
০ বাহুর নিচে তোয়ালে অথবা বালিশ রাখুন যাতে বাহুটা হার্টের বা হৃদপিন্ডের লেভেলে থাকে।
০ পায়ের পাতা মেঝের সমান্তরালে রাখুন, পায়ের উপর পা উঠিয়ে বসবেন না।
০ সাতদিন যাবৎ বাড়িতে সকাল-সন্ধ্যা দুইবার রক্তচাপ পরিমাপের মাত্রাকে বাড়ির রক্তচাপের রেকর্ড হিসাবে গণ্য করা উচিত।
০ সঠিক নিয়মে রক্তচাপ পরিমাপের পর পরই তা লিপিবদ্ধ করুন।
০ বাড়িতে একদিন অথবা প্রথম দিন রক্তচাপ মাপার মাত্রাকে সঠিক ধরা উচিত নয়।
স্বাভাবিক রক্তচাপ কি?
০ দিনে রক্তচাপ অবশ্যই গড়ে ১৩৫/৮৫ মি·মি· অব মার্কারী এর নিচে থাকতে হবে।
০ বাড়িতে মেপে যদি দেখা যায় রক্তচাপ সব সময় ১৩৫/৮৫ মি·মি· অব মার্কারী এর বেশি আছে, তাহলে চিকিৎসা নিতে হবে।
০ ডায়াবেটিস অথবা কিডনী রোগীদের রক্তচাপ ১৩৫/৮৫ মি· মি· অব মার্কারী এর কম হতে হবে।
রক্তচাপের মাত্রা অস্বাভাবিক হলে কি করবেন?
০ আতংকিত হবেন না।
০ আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন এবং তার পরামর্শ মেনে চলুন।
০ নিজে নিজে কোন ওষুধ খাবেন না কিংবা ওষুধের মাত্রা কম-বেশি করবেন না।
রক্তচাপ পরিমাপের সময় করণীয়
কথা বলবেন না
হেলান দিয়ে বসুন
কাফ বাহুর মধ্যবর্তী জায়গায় জড়ান
যাতে বাহুটি হার্টের লেভেলে থাকে
বসে থাকুন।
বাহুটি অবশ্যই কোন কিছুর উপরে রাখুন
পা ছড়িয়ে বসুন।

পেটের যত অসুখ


১৪ কোটি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বাংলাদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক গ্রামাঞ্চলে বসবাস করেন। যারা শহরে বাস করেন তাদেরও সিংহভাগ ভাসমান অবস্থায় চিলেকোঠায় কিংবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকেন। শরীরের বিভিন্ন রোগ ব্যাধি লেগেই থাকে।
এইসব রোগ ব্যাধির মধ্যে বেশিরভাগ লোক যে রোগটিতে ভুলে থাকেন তা হলো পেটের পীড়া। আপনি ধনী হন কিংবা গরীব হন, কখনও পেটের পীড়া হয়নি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে পেটের পীড়ার প্রাদুর্ভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়।
পেটের পীড়া বলতে সাধারণভাবে আমরা বুঝি আমাশয়, ডায়ারিয়া, পেটের ব্যথা কিংবা হজমের অসুবিধা।
পেটের পীড়া সমূহকে প্রধানতঃ দুভাগে ভাগ করা যায়।
প্রথমতঃ খাদ্যনালী (পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, ক্ষুদ্রান্ত্র কিংবা বৃহদান্ত্রের রোগ)।
দ্বিতীয়তঃ লিভারের প্রদাহ।
খাদ্যনালী (পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, ক্ষুদ্রান্ত্র কিংবা বৃহদান্ত)-এর কারণ জনিত পেটের পীড়াকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
১. স্বল্প মেয়াদী পেটের পীড়া
২. দীর্ঘ মেয়াদী পেটের পীড়া
স্বল্প মেয়াদী পেটের পীড়ার কারণসমূহঃ
১. আমাশয় ২. রক্ত আমাশয় ৩. ডায়রিয়া
১. আমাশয়ঃ অ্যামিবিক ডিসেন্ট্রি স্বল্প মেয়াদী পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ যা E. Histolytica নামক জীবাণু দ্বারা সংক্রমিক হয়। এটি মূলতঃ পানিবাহিত রোগ। যারা যেখানে সেখানে খোলা বা বাসী খাবার খেয়ে থাকেন অথবা দূষিত পানি পান করেন তাদের এ রোগ হয়। শহর অঞ্চলে রাস্তার ধারের খোলা খাবার খেলে এ রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে যারা যত্র তত্র মলমূত্র ত্যাগ করেন, কিংবা নদী ও পুকুরের পানি পান করেন তাদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক।
এ রোগের উপসর্গ হঠাৎ করে দেখা দেয়। যেমন, ঘন ঘন পেটে মোচড় দিয়ে পায়খানা হওয়া, পায়খানার সাতে রক্ত বা আম মিশ্রিত থাকতে পারে, পায়খানায় বসলে উঠতে ইচ্ছে হয় না বা উঠতে পারে না। ক্ষেত্র বিশেষ দিনে ২০/৩০ বার পর্যন্ত পায়খানা হতে পারে।
২. রক্ত আমাশয়ঃ রক্ত আমাশর প্রধান কারণ হলো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া যার নাম শিগেলা। এই শিগেলা নামক ব্যাকটেরিয়াও দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। রক্ত আমাশয়ের লক্ষণ হলো-পেটে তীব্র মোচড় দিয়ে ব্যথা হওয়া, অল্প অল্প করে বার বার পায়খানা, পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া এবং মলদ্বারে তীব্র ব্যথা হওয়া।
৩. ডায়রিয়াঃ ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ হল খাদ্যে নানা ধরনের পানিবাহিত ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ।
-ছোট শিশুদের ডায়রিয়া সাধারণ রোটাভাইরাস নামকম ভাইরাস দিয়ে হয়ে থাকে।
-আর বড়দের ক্ষেত্রে নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়া দিয়ে যে ডায়রিয়া মহামারী আকারে দেখা যায় তার অন্যতম কারণ হলো কলেরা। আমাদের দেশে শীতকালে কলেরার প্রাদুর্ভাব বেশি হয়।
পাতলা পায়খানা হলে যদি চাল ধোয়া পানির মতো হয় তবে সেটা কলেরার লক্ষণ। এর সাথে তলপেটে ব্যথা হওয়া, বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া, ঘন ঘন পায়খানায় যাওয়া এবং শরীর আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাওয়া এ রোগের মারাত্মক উপসর্গ। এই সময়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া অতি জরুরী। তাছাড়া পেটের পীড়ার অন্যান্য কারণ সমূহের মধ্যে রয়েছে পিত্তথলির প্রদাহ, পাকস্থলীর প্রদাহ, অগ্নাশয়ের প্রদান এবং অন্ত্রের প্রদাহ।
-দীর্ঘমেয়াদী পেটের পীড়ার মধ্যে রয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী আমাশয়। এই দীর্ঘস্থায়ী আমাশয় মূলতঃ তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমনঃ
১. ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম
২. খাদ্য হজম না হওয়া জনিত পেটের পীড়া
৩. বৃহদান্ত্রের প্রদানজনিত পেটের পীড়া
এই অসুখগুলো মূলতঃ ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্রের রোগ।
ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS): অল্প বয়স্ক বা উঠতি বয়স্ক যারা বিশ্ববিদ্যালয় পড় য়া ছাত্র-ছাত্রী, কিংবা যারা নবীন চাকুরীজীবী তাদের মধ্যে IBS রোগটি বেশি দেখা যায়। এই রোগের লক্ষণ হলো পেটে মোচড় দিয়ে ঘন ঘন পায়খানা হওয়া, যা সকালে নাস্তার আগে ও পরে লক্ষণীয়। IBS হলে অনেকের পায়খানা নরম বা অনেকের পায়খানা কঠিন হয়।
কঠিন বা নরম যাই হোক না কেন রোগীর পায়খানার সাথে বাতাস যায় এবং পেটে অস্বস্তি ভাব কাজ করে। অনেকে বলেন, দুধ, পোলাও কোরমা, বিরিয়ানী খেলে এটি বেশি হয়। পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ এই IBS যাদের হয় তাদের স্বাস্থ্যহানী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
খাদ্য হজম না হওয়া জনিত পেটের পীড়াঃ পেটের পীড়ার আরও একটি কারণ হল Malabsorption Syndrome ।ক্ষুদ্রান্ত্র এবং অগ্নাশয়ে দীর্ঘ মেয়াদী প্রদাহ থাকলে এ রোগটি হয়ে থাকে। প্রচুর পরিমাণে দুর্গন্ধযুক্ত, সাদা পায়খানা বের হওয়া, পায়খানার সাথে হজম না হওয়া খাদ্য কনার মিশ্রন এবং নির্গত মল পানির উপরে ভাসতে থাকা এ রোগের অন্যতম উপসর্গ। এর সাথে পেটে মোচড় দিয়ে ব্যথা হওয়া, পেট ফুলে পাওয়া কিংবা ধীরে ধীরে শরীরের ওজন কমে যাওয়া এ রোগের লক্ষণ।
বৃহদান্ত্রের প্রদাহ জনিত পেটের পীড়াঃ এটি একটি মারাত্মক ব্যাধি। অবশ্য আমাদের দেশে এ রোগের প্রাদুর্ভাব কম, উন্নত বিশ্বে এই রোগ বেশি হয়। এ রোগের লক্ষণ হলো আম ও রক্তমিশ্রিত পায়খানা হওয়া, জ্বর কিংবা জ্বর জ্বর ভাব হওয়া এবং শরীর আস্তে আস্তে ভেঙ্গে যাওয়া।
সব বয়সের মানুষের এ রোগ হয়। Colonoscopy নামক পরীক্ষার মাধ্যমে এ রোগ সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় এবং বিশেষ চিকিৎসা পেলে এ রোগ ভাল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এছাড়া পিত্তথলির পাথর, পিত্তনালীর প্রদাহ, অগ্নাশয়ের প্রদাহ এবং পাকস্থলির ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহের কারণে পেটের পীড়া হতে পারে। এবার সে সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা যাকঃ
পিত্তথলির পাথর ও পিত্তনালীর প্রদাহ জনিত পেটের পীড়াঃ পিত্তথলির পাথর ও পিত্তনালির প্রদাহের ফলে যাদের পেটের পীড়া হয়, তাদের তীব্র পেট ব্যথা হতে পারে। কয়েকদিন পর পর ব্যথা উঠে এবং কয়েকদিন পর্যন্ত তা থাকে। ব্যথার সাথে বমি ও জ্বর হতে পারে। ব্যথাটা পেটের ডানপাশে উপরিভাগে অনুভূত হয়। ব্যথা তীব্র হলে রোগী কষ্টে কাতরাতে থাকেন।
অগ্নাশয়ের প্রদাহ জনিত পেটের পীড়াঃ পেটের পীড়ার আরও একটি কারণ হল অগ্নাশয়ের প্রদাহ বা Pancreatitis অগ্নাশয় একটি লম্বা অঙ্গ বা Organ যা পেটের ভিতরে পেছনে অবস্থিত। এই অগ্নাশয়ের কাজের উপর নির্ভর করে হজমের ক্ষমতা এবং রক্তে গস্নুকোজের পরিমাণ ঠিক রাখা। স্বল্পমেয়াদী অগ্নাশয়ের প্রদাহ হলে তাকে Acute Pancreatitis বলে, যার অন্যতম কারণঃ
১. ভূরিভোজ করা।
২. পিত্তনালী বা পিত্তথলিতে পাথর এবং
৩. অ্যালকোহল পানে আসক্তি
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃদু বা সহনীয় ব্যথা ভাল হয়ে যায়। তবে অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসায় বিলম্ব কিংবা অবহেলা করলে জটিল আকার ধারণ করতে পারে এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে।
পাকস্থলি ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহঃ উপরের পেটে দীর্ঘদিন বার বার ব্যথা হওয়া, Peptic Ulcer রোগের লক্ষণ যা পাকস্থলি (Stomach বা ক্ষুদ্রান্ত্রের ( Duodenum) এর প্রদাহের কারণে হয়। এই প্রদাহ দুরারোগ্য ব্যাধি। যাদের হয়, বার বার হয়। রোগীও সারে না, রোগও ছাড়ে না।
এই রোগকে পেটের পীড়ার অন্যতম কারণ হিসাবে বলা যায়। কেননা আমাদের দেশে ১২% লোক Peptic Ulcer -এ ভুগছেন। এছাড়া যারা অনিয়মিত খান, অতিরিক্ত ধূমপান করেন তাদের এ রোগ বেশি হয়।
লক্ষণের মধ্যে রয়েছে, খালি পেটে ব্যথা, শেষরাতে ব্যথা এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যথা। এ রোগ সেরেও সেরে উঠে না। এবারের শেষটায় এসে যে কথা বলতে চাই-খাবারের প্রতি অনীহা, অরুচি, অস্বস্তি, ওজন কমে যাওয়া- এসব কিছুরই অন্যতম কারণ দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহ। এ দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহ এমন আকার ধারণ করে যা কিনা দীর্ঘস্থায়ী জটিল লিভার সিরোসিসে রূপ নিতে পারে।
পেটের পীড়ার চিকিৎসাঃ -স্বল্পমেয়াদী পেটের পীড়ায় আক্রান্ত রোগীর শরীর খুব তাড়াতাড়ি পানি শূন্য হয়ে যায়। তাই এ অবস্থা প্রতিরোধের জন্য রোগীরকে প্রচুর পরিমাণে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে এবং প্রতিবার পাতলা পায়খানা হওয়ার পর খাবার স্যালাইন খাওয়ানো বাঞ্ছনীয়।
-রোগীর শরীরে জ্বর থাকলে এবং পেটে ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে রোগীকে প্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক প্রদান করতে হবে।
-শিশুদের ক্ষেত্রে যেহেতু ভাইরাসজনিত কারণে পেটের পীড়া বেশি হয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রোগীকে কোনো প্রকার ওষুধ না খাওয়ানোই শ্রেয়। তবে শিশুর শরীর যাতে পানি শূন্য না হয়, সেজন্য প্রতিবার পাতলা পায়খানা হলে শিশুকে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি শিশুকে তার সকল প্রকার খাদ্য প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে। যদি শিশু মায়ের দুধ পান করে থাকে, তবে কোনো অবস্থাতেই তা বন্ধ করা যাবে না।
-দীর্ঘমেয়াদী পেটের পীড়া যেহেতু পিত্তথলির পাথর, পিত্তনালীর প্রদাহ, অগ্নাশয়ের প্রদাহ, পাকস্থলির ও ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রদাহ, বৃহদান্ত্রের প্রদাহ এবং দীর্ঘমেয়াদী লিভারের প্রদাহের কারণে হয় তাই এ সমস্ত ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াই শ্রেয়। অনেকে কবিরাজি, গাছ-গাছড়া বা ঝাড় ফুকের মাধ্যমে এ জাতীয় পেটের পীড়া থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে রোগীর ভেগান্তিই কেবল বাড়ে এবং রোগও জটিল রূপ ধারণ করে।
পেটের পীড়া প্রতিরোধে করণীয়ঃ
১. পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হলে ভীত না হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
২. খাদ্র গ্রহণের পূর্বে এবং মলত্যাগের পর নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে। যে সমস্ত অভিভাবক শিশুকে খওয়ান, তারা শিশুকে খাবার প্রদানের পূর্বে এবং শিশুর মলত্যাগের পর একই নিয়মে হাত পরিষ্কার করবেন।
৩. পরিষ্কার পানিতে আহারের বাসনপত্র, গৃহস্থালী ও রান্নার জিনিস এবং কাপড়-চোপড় ধোয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং প্রয়োজনে সাবান ব্যবহার করতে হবে।
৪. পায়খানার জন্যে সর্বদা স্যানেটারী ল্যাট্রিন ব্যবহার করতে হবে। 
৫. রান্নাঘর ও বাথরুমের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে হবে।
৬. যারা গ্রামে বসবাস করেন, তাদের যেখানে সেখানে বা পুকুর নদীর ধারে মলত্যাগের অভ্যাস পরিহার করতে হবে।
৭. খালি পায়ে বাথরুমে বা মলত্যাগ করতে না গিয়ে সর্বদা স্যান্ডেল বা জুতা ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
৮. খাবারের জন্য ফুটানো পানি ব্যবহার করতে হবে এবং পানি ফুটানোর ব্যবস্থা না থাকলে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করতে হবে।
৯. আহারের জন্য তৈরিকৃত খাদ্য সামগ্রী এবং পান করার জন্য নির্ধারিত পানি সর্বদা ঢেকে রাখতে হবে।
১০. পুরোনো, বাসী বা দুর্গন্ধযুক্ত খাবার কখনোই খাওয়া যাবে না।
মনে রাখবেন, পেটের পীড়া প্রতিরোধে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় পন্থা। আপনি আপনার খাদ্যাভাস, পানি পান, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা সর্বোপরি ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সচেতন হলে পেটের পীড়া থেকে মুক্ত হতে পারবেন।

খাদ্যে অ্যালার্জি ও করণীয়

নানা রকম জিনিস যা আমরা খেয়ে থাকি, আমাদের শরীরে লাগে বা ভেতরে ঢোকে এবং তার বিরুদ্ধে অতি বা পরিবর্তিত এবং বর্ধিত প্রতিক্রিয়া শরীরে হলে তবে তাকে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া বলে। গরুর দুধ, গরুর মাংস, ডিম, কলা, বেগুন, চিংড়ি, ইলিশ মাছ তো আমরা সবাই খাই। কেউ কেউ এসব খেয়ে পেট ব্যথা, হাঁপানি বা সর্দিতে ভোগেন। এগুলোই হলো খাদ্যের অ্যালার্জিক রিঅ্যাকশন। ৬ থেকে ৮ ভাগ শিশু এবং ১ থেকে ২ ভাগ বৃদ্ধ সচরাচর খাদ্য অ্যালার্জিতে ভুগে থাকেন। তবে জন্ম হওয়ার প্রথম বছরের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। 

প্রকারভেদ 
ফুড অ্যালার্জিঃ খাদ্য গ্রহণ করার পর অস্বাভাবিক ইমুনোলজিক্যাল ছাড়া অন্য প্রতিক্রিয়ায় খাদ্য গ্রহণ করার পর অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

কোন কোন খাদ্য থেকে অ্যালার্জি হয়ে থাকে?
গরুর দুধ, ডিম, বাদাম, সয়াবিন, ইলিশ, চিংড়ি, পুঁটি, বোয়াল, শৈল, বেগুন, কুমড়া, কচু ইত্যাদি।
খাদ্যে অ্যালার্জিজনিত লক্ষণগুলো শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে দেখা দেয় যেমনঃ 
-ত্বকে বা চামড়ায় চুলকাতে থাকে এবং সঙ্গে সঙ্গে চাকা চাকা হয়ে লাল হয়ে ওঠে। 
-চোখ চুলকানো, পানিপড়া, লাল হয়ে ওঠা, ফুলে ওঠা। 
-উপরের শ্বাসনালীতে, নাকে ও গলায় চুলকাতে থাকে। গলা ফুলে গেছে বলে মনে হয়, এমনকি কথা বলার সময় অসুবিধা হয়, নাক দিয়ে পানি পড়া, নাক বন্ধ বন্ধ ভাব, অনেক সময় শব্দও থাকে। 
-নিচের শ্বাসনালীতে শ্বাসকষ্ট, কাশি, দম খাটো খাটো ভাব, বাঁশির মতো আওয়াজ। 
পরিপাকতন্ত্রেঃ বমি বমি ভাব, পেটে ক্যাম্প বা ব্যথা, ডায়রিয়া দেখা যায়। 

কীভাবে এ রোগ নির্ণয় করা যায়? 
রোগের ইতিহাস থেকে যেমন কত সময় ধরে শুরু হয়েছে, রোগের লক্ষণ, খাদ্য গ্রহণ ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যবর্তী সময় এবং এটপিক ডার্মাটাইটিস, অ্যাজমা, অ্যালার্জিক রাইনাইটিস রোগে ভুগে থাকেন কিনা। 
ল্যাবরেটরি পরীক্ষা-স্কিন প্রিক টেষ্ট, স্পেসিফিক আইজিই।
খাদ্য তালিকা থেকে অ্যালার্জিজনিত খাদ্যদ্রব্যাদি বাদ দিয়ে পরীক্ষাঃ রোগীর ইতিহাস ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অ্যালার্জিক খাবার শনাক্ত করার পর ওই খাবার দুই থেকে ছয় সপ্তাহ বাদ দেয়ার পর যদি রোগের লক্ষণগুলো সেরে যায় তবে বুঝতে হবে যে ওই খাদ্যেই এই অ্যালার্জির জন্য দায়ী। 

অ্যালার্জি খাদ্য না খেয়েও অ্যালার্জি খাদ্যের সংস্পর্শে এলেও কি প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে? 
হ্যাঁ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে হতে পারে। যেমন কড়াইতে চিংড়ি সিদ্ধ করার সময় বায়ুবাহিত কিছু প্রোটিন বের হয় এবং শ্বাসনালীর ভেতর ঢুকেই এনাফাইলোটিক রিঅ্যাকশন দেখা দিতে পারে। 
এটা বোঝার উপায় হলো যদি অ্যালার্জিক খাবার খাওয়া হয় এবং ওই খাদ্য খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যদি বেশি ব্যায়াম করা হয়। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সচরাচর দেখা দেয়। 

অ্যালার্জিজনিত খাদ্য খাওয়ার পর অ্যাজমা হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? 
সাধারণত অ্যালার্জিজনিত খাদ্য খাওয়ার পর শুধু অ্যাজমা হয় না, তবে অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে অ্যাজমার উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে অ্যালার্জিজনিত খাদ্য খাওয়ায় অন্যান্য প্রতিক্রিয়া যেমন ঠোঁট ফুলে ওঠে, মুখ চুলকানো, নাক দিয়ে পানি পড়ে, চোখ ফুলে ওঠার সঙ্গেও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। অ্যাজমা আক্রান্ত রোগীদের জিজ্ঞেস করলে তাদের ২০-৬০ ভাগ মনে করেন তাদের অ্যাজমার জন্য কোনো না কোনো খাদ্য দায়ী। যেসব খাদ্য তাদের অ্যাজমার জন্য দায়ী মনে করেন, সেই খাদ্য তাদের খাওয়ানোর পর দেখা যায় মাত্র ২-৫ ভাগ ক্ষেত্রে তাদের ফুসফুসের ক্ষমতা কমে গেছে যা অ্যাজমা রোগের তীব্রতার পরিমাণ বেড়েছে। শিশুদের ৬-৮ ভাগ অ্যাজমা এই অ্যালার্জিজনিত খাদ্য থেকে হয়ে থাকে। বড়দের ক্ষেত্রে খুব কমই খাদ্য থেকে হয়ে থাকে। তাই অ্যাজমা আক্রান্ত রোগীরা প্রায়ই অ্যালার্জিজনিত খাদ্য খান না, যদিও ওই খাদ্যগুলো খেলে তাদের অ্যাজমায় আক্রান্ত হওয়ার কোনো ভয় নেই। 

গেঁটেবাতের লক্ষণ ও চিকিৎসা


গেঁটেবাত বা গাউট হলো অনেক উপসর্গের সমষ্টি। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মানুষ গেঁটেবাত রোগের সাথে পরিচিত। গেঁটেবাত কয়েকটি অতি প্রাচীন রোগের মধ্যে একটি। আজ থেকে প্রায় ৮০০ বছর আগে গেঁটেবাতের নাম প্রথমবারের মতো গাউট রাখা হয়।
পুরুষদের এ রোগ হওয়ার প্রবণতা বেশি। গেঁটেবাত সাধারণত কমবয়সী পুরুষ ও বেশিবয়সী মহিলাদের হয়ে থাকে। এ ছাড়াও কৈশোর-উত্তর থেকে মধ্যবয়সের পুরুষদের এ রোগ হওয়ার প্রবণতা বেশি বলে মনে করেন আধুনিক বিজ্ঞানীরা। মহিলাদের সাধারণত রোগ হয় না বললেই চলে, তবে স্রাব-উত্তর প্রৌঢ় মহিলা অর্থাৎ ঋতুস্রাব ব হওয়ার পর মহিলাদের মধ্যে এ রোগ দেখা দিতে পারে। শহরে ধনীসমাজ থেকে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাব একেবারেই কম বলে মনে করা হয়।
গেঁটেবাত একপ্রকার সিন্ড্রোম যা ইউরেট নামক একপ্রকার লবণদানা জমে জোড়া বা সËিত সৃষ্ট প্রদাহ, যা দেহের রক্তের প্লাজমায় অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিডের উপস্থিতির ফলেই ঘটে থাকে। গেঁটেবাত স্বল্পকালীন তীব্র প্রদাহ বা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ এই দুই প্রকারের হতে পারে। আবার যে কারণে রক্তের ইউরেট লবণ বেড়ে যায় তা বিভিন্ন কারণে হতে পারে যেমন- পারিপার্শ্বিক বা পরিবেশগত কারণ, ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাসের কারণে বা ব্যক্তির জন্মগত ত্রুটির কারণে, যাকে জিনেটিক কারণও বলা যায়।
গেঁটেবাতের কারণগুলোর মধ্যে রক্তে অতিরিক্ত ইউরেট লবণ বা ইউরিক অ্যাসিডের উপস্থিতির কথা আগেই বলা হয়েছে। অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড দেহে দু’ভাবে জমতে পারে। যেমনঃ অতিরিক্ত ইউরিক অ্যাসিড উৎপাদন এবং ইউরিক অ্যাসিড দেহ থেকে নির্গত হতে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া। ইউরিক অ্যাসিড দেহ থেকে সাধারণত কিডনির সাহায্যে বের হয়। কোনো কারণে, বিশেষ করে কিডনির রোগের কারণে কিডনির কর্মক্ষমতা হ্রাসে অসুবিধা হতে পারে।
গেঁটেবাতের লক্ষণ
এই রোগের প্রধান প্রধান উপসর্গের মধ্যে পায়ের বুড়ো আঙুলের অসহনীয় ব্যথাসহ হাঁটু, গোড়ালি বা কাঁধে ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা সাধারণত প্রোটিনজাতীয় খাবার খেলে বেড়ে যেতে পারে।
? হঠাৎ তীব্র ব্যথা, এমনকি ব্যথার দরুন ঘুম ভেঙে যাওয়া। ? পায়ের বুড়ো আঙুলের গোড়া ফুলে লাল হয়ে যাওয়া। ? হাঁটু, কনুই বা অন্য যেকোনো জোড়া বা স িফুলে যাওয়া। ? ক্রমান্বয়ে হাড় ও তরুণাস্থি ক্ষয় হতে থাকে। ? ইউরেট লবণের দানা জমাট বেঁধে টফি তৈরি করতে পারে। ? ক্রমান্বয়ে জোড়া বা স িস্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারাতে পারে।
গেঁটেবাতের চিকিৎসা ও এর প্রতিকার
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথমত, রোগীর আক্রান্ত স্থানকে বিশ্রামে রাখতে হবে। বেদনানাশক ওষুধ হিসেবে ওষনসশপয়ভথধমষ বেশ কার্যকর। তা ছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এলুপিউরিনল ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। এই রোগীদের পিউরন সমৃদ্ধ খাবার যেমন, কবুতরের গোশত, হাঁসের গোশত, গরুর লাল গোশত, সামুদ্রিক মাছ, মাছের ডিম, ছোট মাছ, মগজ, কলিজা, পুঁইশাক, ফুলকপি ও সিমের বিচি বর্জন করা উচিত।

গেঁটেবাতের চিকিৎসায় প্রাথমিক তীব্র ব্যথার জন্য বেশ কিছু ব্যথার ওষুধের কথা বলা হয়েছে, যার সবগুলোকে একসাথে এনএসআইডি বলা হয়। এদের মধ্যে ইন্ডোমেথাসিন এ ব্যাপারে বহুল ব্যবহৃত। গেঁটেবাতের অ্যাকুট অবস্থার তীব্র ব্যথার জন্য কোলচিসিনও খুবই কার্যকর। গেঁটেবাতের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য অনেক ওষুধ থাকলেও এলুপিউরিনল নামক ওষুধটিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়। এ ছাড়াও রক্তের ইউরিক অ্যাসিড কমানোর জন্য ইউরিকোসইউরিক এজেন্ট নামে কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হয়, যেমনঃ প্রোবেনাসিড। অসুস্থ হলে রোগীর প্রয়োজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, নিজে ওষুধ খাওয়া নয়। তা ছাড়া গেঁটেবাত হলে হাত বা পায়ের দিকে বেশি নজর দিতে হবে যাতে হাত বা পায়ে কোনো আঘাত না লাগে। কারণ আঘাত লাগলে এ রোগ তীব্রতা বেড়ে যায়। তাই আসুন, গেঁটেবাত হলে এর উপযুক্ত চিকিৎসা করাই এবং এ রোগকে নিয়ন্ত্রণ করি।
লেখকঃ বাত, ব্যথা ও প্যারালাইসিস বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক, ফিজিক্যাল মেডিসিন, বঙ্গবু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। 

উচ্চ রক্তচাপ ও খাদ্য


উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে খাদ্যের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই রক্তের চাপ কমাতে প্রথমেই খাবারের ব্যাপারে সজাগ হওয়া দরকার। দেখা গেছে, খাবারে সোডিয়াম, ক্যালরি, আমিষ ও চর্বি কমিয়ে ফেললে তা রক্তচাপ কমাতে বেশ কাজে দেয়। একটা ধারণা প্রচলিত আছে, রক্তচাপ বাড়া ও কমার সঙ্গে লবণের বেশ সম্পর্ক রয়েছে। যদি দৈনিক ৪ গ্রাম লবণ খাওয়া হয়, তাহলে রক্তচাপ একেবারে স্বাভাবিক থাকে। তবে এটি এখনো প্রমাণিত হয়নি যে উচ্চ রক্তচাপের কারণ অথবা উচ্চ রক্তচাপ সারানো একমাত্র লবণ গ্রহণ ও বর্জনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু লবণ গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই সুফল বয়ে আনে।

কোনো কোনো খাবারে লবণ থাকলেও তা বোঝা যায় না। যেমন মাংস, কোনো কোনো সবজি, সামুদ্রিক মাছ, ডিম, সয়াসস, পটেটো টিপস ইত্যাদি। আবার বাণিজ্যিকভাবে তৈরি খাবারে আলাদাভাবে লবণ দেওয়া থাকে। যেমন বারবিকিউ, ্নোকড ফিশ, আচার, পনির, স্যুপ কিউব, পিকেলস ইত্যাদি। তাজা ফলে সোডিয়াম একেবারেই কম থাকে। তাই উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য এটি খুবই ভালো। এক গ্লাস দুধে সোডিয়াম আছে ১২৬ মিলিগ্রাম। আর একটি ফলে সোডিয়াম আছে প্রকারভেদে ১-২৫ মিলিগ্রাম। শিকাগোর নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল স্কুলের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যায়, যাদের উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা রয়েছে, তারা যদি দিনে ৫ গ্রামের (এক চা-চামচ) কম লবণ খায়, তাহলে উচ্চ রক্তচাপ এড়াতে পারেন। ২০১ জনের ওপর পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে এই গবেষণা চালানো হয়। এতে নারী-পুরুষ উভয়ই ছিল এবং তাদের বয়স ছিল ৩০ থেকে ৪৪ বছর।
উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে হৃদরোগের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রাণিজ চর্বি যেমন ঘি, মাখন, মাংসের চর্বি না খাওয়াই ভালো। বনস্পতি ও মার্জারিন উদ্ভিজ্জ চর্বি হলেও ঘনত্বের কারণে এগুলো বাদ দেওয়াই ভালো। আবার উদ্ভিজ্জ তেল খেতে বাধা না থাকলেও বেশি পরিমাণে গ্রহণ শরীরের ওজন বাড়ায়। তাই খাবার হতে হবে পরিমিত এবং কম চর্বিযুক্ত। দৈনিক ৩০ থেকে ৫০ গ্রাম পর্যন্ত চর্বি গ্রহণ করা যেতে পারে। মাছের চর্বি নিশ্চিন্তে খাওয়া যেতে পারে। কারণ, এই চর্বি কোনো সমস্যা নয়, এটি সহজপাচ্য শর্করা, যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। যেমন ভাত ও ফেন। উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা একটি সুষম খাবার তালিকা অনুসরণ করলে ভালো হয়। যার অনুপাত হবে ২০ শতাংশ শর্করা, ১০ থেকে ১৫ শতাংশ আমিষ এবং ৫ শতাংশ চর্বি। এই পরিকল্পনায় কাঁচা খাবার থাকবে প্রধান ও দ্বিতীয় প্রাধান্য থাকবে রান্না করা খাবারের। হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের আপাতদৃষ্টিতে অসুস্থ মনে হয় না বলেই একে নিঃশব্দ ঘাতক বলা হয়। তবে জীবনযাত্রায় সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে এবং খাবারদাবারে কিছুটা সচেতন ও যত্নবান হলেই এটা এড়ানো যায়।

**************************
আখতারুন নাহার
প্রধান পুষ্টি কর্মকর্তা, বারডেম  

টাইফয়েড জ্বর চিকিৎসা ও প্রতিরোধ


বাংলাদেশের জীবনযাত্রার মান তেমন স্বাস্হ্যকর নয়। তাই এখানে টাইফয়েডের রোগজীবাণু সহজেই সংক্রমিত হয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর গড়ে ১ হাজার জনের মধ্যে ৪ জন টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়। আর ৫ বছর বয়সের নিচের শিশুদের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ১ হাজার জনের মধ্যে ১৯ জন টাইফয়েডে ভোগে। অর্থাৎ অন্যান্য অনেক রোগের মতো টাইফয়েডের হুমকিও শিশুদের জন্যই বেশি। উন্নত বিশ্বে যথাযথ স্বাস্হ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার কারণে তারা প্রায় টাইফয়েডমুক্ত।

টাইফয়েডের জীবাণু দুষিত পানি ও দুষিত খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। মাছি এ রোগবিস্তারে বেশি দায়ী। শুষ্ক মৌসুমে পানি দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠে কিংবা বর্ষা মৌসুমে পানিবাহিত রোগের বিস্তারের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই এ দুই মৌসুমেই এই রোগ বেশি হয়।
টাইফয়েড মুলত পরিপাকতন্ত্রের রোগ। কোনো জ্বরই নিজে কোনো রোগ নয়; বরং অন্য কোন রোগের উপসর্গ হিসেবে শরীরে জ্বর আসে। এ রোগের জীবাণু দ্বারা পরিপাকতন্ত্র সংক্রমিত হয়। আর এ কারণেই জ্বর হয়।
লক্ষণঃ টাইফয়েড রোগের সুচনাটা একটু কপট ধরনের; অর্থাৎ আক্রান্ত হওয়ার পরেও বেশ কিছুদিন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। রোগ শুরুর দিকে চাপা অস্বস্তি, মাথা ব্যথা, ঝিমঝিম করা, শরীরময় ব্যথা ইত্যাদি অনুভুত হয়। সাধারণত জ্বর একটু বাড়ে, পরে আবার একটু কমে। এভাবে ক্রমাগত বাড়া-কমার মাধ্যমে প্রথম সপ্তাহে জ্বর মোটের ওপর বাড়তে থাকে। দ্বিতীয় সপ্তাহে তাপমাত্রা বাড়া-কমার মাধ্যমেও মোটামুটি একটা সীমার মধ্যে থাকে। তৃতীয় সপ্তাহে বাড়া-কমার মাধ্যমে জ্বর কমতে থাকে। ডায়রিয়া বা বমি হতে পারে। কখনো কোষ্ঠকাঠিন্যও হতে পারে। পেট ফেঁপে ওঠে, কাশি হয়, প্লীহা বড় হতে পারে। পেটের ওপরের দিকে বা পিঠে লালচে দাগ হতে পারে, যা একটু চাপ দিলে হালকা হয়ে যায়। রোগী প্রলাপ বকতে পারে, এমনকি অচেতনও হতে পারে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষাঃ রক্তের সাধারণ পরীক্ষা করতে হবে। প্রথম সপ্তাহে রক্ত কালচার করলে জীবাণু পাওয়া যেতে পারে। অবশ্য রক্তের কালচারে প্রথম সপ্তাহের পরও জীবাণু পাওয়া যায়। বহুল প্রচলিত ভিডাল টেস্টের মাধ্যমে দ্বিতীয় সপ্তাহে জীবাণুর উপস্হিতির প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। তবে এ পরীক্ষার ফলাফল নিশ্চিত কোনো তথ্য দেবে না এবং এ ফলাফলে যথেষ্ট সংশয়ের বিষয় রয়েছে। তৃতীয় সপ্তাহ থেকে পায়খানা কালচারেও জীবাণু পাওয়া যেতে পারে।
চিকিৎসাঃ চিকিৎসার জন্য শরীরে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যাস আছে কি-না তা পরীক্ষা করা উচিত। এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যাস থাকলে শরীরে কোনো কোনো ওষুধ কারো কারো ওপর কোনো কাজ করবে না। ২০০১ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫০ ভাগের কম ক্ষেত্রে এম্পিসিলিন, কোট্রাইমোক্সাজল, ক্লোরামফেনিকল ইত্যাদি কাজ করেছে, ৯৮ ভাগের ক্ষেত্রে সেফট্রায়োক্সোজন কাজ করেছে এবং সবক্ষেত্রেই সিপ্রোফ্লোক্সাসিন কাজ করেছে।

সিপ্রোফ্লোক্সাসিন সবার জন্য প্রযোজ্য নয়, বিশেষত শিশু ও বয়োসন্ধিকালীনদের জন্য প্রযোজ্য নয়। চিকিৎসক সার্বিক বিবেচনা করে ওষুধ দেবেন। বিভিন্ন ওষুধে রেজিস্ট্যান্টদের ক্ষেত্রে সেফট্রায়োক্সোন ব্যবহার করা যায়। রোগের মেয়াদ দীর্ঘ হলে বা রোগী খুবই কাতর হলে স্টেরয়েড দেয়া যেতে পারে।
টিকাঃ বর্তমানে এ রোগের টিকা পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুর এক বছর বয়সের মধ্যে টিকা নেয়াই সবচেয়ে ভালো।
জটিলতাঃ উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে টাইফয়েড সংকটাপন্ন পরিস্হিতি তৈরি করতে পারে। পরিপাকতন্ত্র থেকে রক্তপাত হতে পারে, এমনকি পরিপাকতন্ত্র ছিদ্র পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। এ রোগের কারণে হাড় বা সন্ধিতে প্রদাহ, মেনিনজাইটিস, পিত্তথলিতে ইনফেকশন, নিউমোনিয়া, শরীরের বিভিন্ন স্হানে ফোঁড়া, স্নায়বিক সমস্যা ইত্যাদি হতে পারে। বিভিন্ন জটিলতা থেকে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

প্রতিরোধ
- বিশুদ্ধ পানি পান;
- খাবার পরিষ্কার রাখা;
- পাস্তুরিত বা ফুটানো দুধ খাওয়া;
-স্বাস্হ্যকর বর্জø নিষ্কাশন ব্যবস্হা;
- ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা।
মোট কথা টাইফয়েড রোগ নিরাময়ে স্বাস্হ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। খাবার ও পানীয়ের পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমেই এই জটিল রোগ এবং এর ভয়াবহ জটিলতা এড়ানো সম্ভব। শিশু-কিশোরদের জন্য এ রোগে বিশেষ সতর্কতা একান্ত আবশ্যক।

ডায়াবেটিস প্রতিরোধে ভিটামিন-সি


ভিটামিন-সি পানিতে দ্রবণীয় একটি ভিটামিন। এটি একটি এন্টি-অক্সিডেন্ট। মানব শরীরে এর প্রয়োজনীয়তা অনেক। শরীরের ক্ষত শুকাতে, খাদ্যনালী থেকে লৌহ শোষণ করতে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কত কাজে দরকার ভিটামিন-সি! অনেক রোগ প্রতিরোধেও ভিটামিন-সি কার্যকর। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে এসব।
ডায়াবেটিসের জটিলতা প্রতিরোধেঃ রক্তের প্রোটিনের সাথে সুগারের বন্ধন কমিয়ে দেয় ভিটামিন-সি। আর এই বন্ধন কমিয়ে দেয়ার কারণে ডায়াবেটিসের জটিলতা কমায় বেশ। টাইপ ২ ডায়াবেটিসের রোগী দীর্ঘদিন ভিটামিন-সি গ্রহণ করলে তাদের চোখের জটিলতা রেটিনোপ্যাথী হবার সম্ভাবনা কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। এসবই বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল। আরো অনেক রোগ প্রতিরোধেও হয়ত ভিটামিন-সি কার্যকর। সুতরাং শরীরের প্রয়োজনে এবং বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রত্যহ আমাদের পর্যাপ্ত ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। লেবু, আমলকী, পেয়ারা, জাম্বুরা, আনারস, আমড়া, কাঁচা মরিচ, জলপাই, বড়ই, কামরাঙা, কমলালেবু ইত্যাদি ভিটামিন-সি এর গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এসবই সস্তা এবং সহজলভ্য। আছে আমাদের হাতের কাছেই।

মশাবাহিত রোগ

মশার কামড়ে যেসব রোগ মানুষের দেহে ছড়ায় সেগুলো হচ্ছে­ ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ফাইলেরিয়া। মশাবাহিত রোগ নিয়ে সম্প্রতি অনেক লেখালেখি হচ্ছে। এমনকি মৃত্যুর খবরও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। 
ক. ম্যালেরিয়াঃ এই রোগ কয়েক ধরনের পরজীবী জীবাণু দ্বারা হয়। জীবাণু ভেদে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগীদের কেঁপে কেঁপে খুব জ্বর হয় এবং জ্বর ছাড়ার সময় অতিরিক্ত ঘাম হয়। কারো কারো বেলায় যথাসময়ে রোগ নিরূপণ ও সঠিক চিকিৎসা না পেলে জটিলতার সৃষ্টি হয়, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। 
রোগ নির্ণয়ঃ এই রোগ আমাদের দেশে সনাতন পদ্ধতিতে মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে রক্ত পরীক্ষা করে নির্ণয় করা হয়। এতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ম্যালেরিয়া জীবাণু দেহে থাকা সত্ত্বেও অনেক কারণে জীবাণু পাওয়া যায় না। যেমন­ 

১. প্রচণ্ড জ্বরের সময় রক্ত দিতে হয়, কিন্তু রোগীরা ওই সময় সাধারণত রক্ত দেয় না। 
২. রক্ত যথেষ্ট পরিমাণ জীবাণু থাকতে হয়। 
৩. তা ছাড়া মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে জীবাণু চেনার জন্য দক্ষ চিকিৎসক বা প্যারামেডিক্স প্রয়োজন
ইমিউনোলজি বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নয়ন ও চমৎকার অবদানের সাথে সাথে আধুনিক স্পট টেস্ট/আইসিটি/ইউমি নোক্রোম্যাটোগ্রাফি পদ্ধতিতে এই রোগ কয়েক মিনিটে নির্ণয় করা যায়। এই স্পট টেস্ট করার জন্য জ্বরের কোনো প্রয়োজন নেই। শহরে, গ্রামে সব স্থানেই এটা করা যায়। কোনো মাইক্রোস্কোপ বা দক্ষ চিকিৎসকের প্রয়োজন হয় না। মাত্র দুই ফোঁটা রক্ত আইসিটি একটি কার্ডে দিলে সাথে সাথে ম্যালেরিয়া রোগ আছে কি না জানা যাবে, এমনকি কোন ধরনের জীবাণু তাও জানা যাবে। মাঠপর্যায়ে যেকোনো স্থানে রোগীর কাছে এই পরীক্ষা করা সম্ভব। 

খ) ডেঙ্গু জ্বরঃ এই রোগ এক ধরনের ভাইরাস দ্বারা হয় এবং মশার কামড়ে একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায়। এই রোগেও জ্বর হয় এবং অন্যান্য উপসর্গে, জটিলতার কারণে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। 

রোগ নির্ণয়ঃ বর্তমানে এই রোগ কিছু বিশেষ ল্যাবরেটরিতে যেমন মহাখালী আইইডিসিআরে বিশেষ ইমুনোলজিক্যাল (ডেঙ্গু ব্লট) পদ্ধতিতে করা হয়। এতে প্রায় ৪ থেকে ২৪ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বা স্পেশালাইজড হাসপাতাল বা প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে করা হয় না। ইমুনোলজি বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নয়নের সাথে সাথে ম্যালেরিয়ার মতো আধুনিক স্পট টেস্ট/আইসিটি/ইমুনোক্রোম্যাটোগ্রাফি পদ্ধতিতে এই রোগও কয়েক মিনিটে নির্ণয় করা যায়। শহরে, গ্রামে সব স্থানেই এই পরীক্ষা করা সম্ভব, সাথে সাথে ডেঙ্গু রোগ আছে কি না জানা যাবে। 

গ. ফাইলেরিয়াঃ ফাইলেরিয়া একটি সংক্রামক ব্যাধি, পরজীবী জীবাণু দ্বারা হয়। মশার মাধ্যমে এই রোগটি ছড়ায়। ফাইলেরিয়া জীবাণু সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশের কয়েক বছর পর এর জটিলতা দেখা দিতে শুরু করে। 

রোগের লক্ষণ ও জটিলতাঃ মশার কামড়ের পর এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রথম দিকে কয়েক বছর মাঝে মধ্যে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ, গা চুলকানো ও শরীরে লালগুটি পড়া ইত্যাদি দেখা যায়। এরপর আস্তে আস্তে আক্রান্ত লিম্পগ্লান্ডের মাধ্যমে তরল পদার্থের সঞ্চালন বন্ধ হয়ে যায় এবং হাত-পা, অণ্ডকোষ, স্তন ইত্যাদি ফুলে বিকৃত হয়ে যায়। রোগী চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে পড়ে। 

রোগ নির্ণয়ঃ মাইক্রোফাইলেরিয়া জীবাণুগুলো রোগীর লিম্প বা নালি হতে বের হয়ে রক্তনালীতে আসে এবং দিনের বেলায় দেহের অভ্যন্তরের বিভিন্ন অঙ্গে যেমন­ কিডনি, ফুসফুস ইত্যাদিতে থাকে। রাতের অন্ধকারে জীবাণুটি দেহের উপরিভাগের ত্বক সংলগ্ন শিরা উপশিরায় আসে। তাই রাতের অন্ধকারে রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে রোগীর রক্ত সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে এই জীবাণু দক্ষ চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মী কর্তৃক শনাক্ত করতে হয়। তবে মাইক্রোস্কোপিক পরীক্ষায় পাওয়ার জন্য রক্তে অনেক বেশি জীবাণু থাকতে হবে। এই পদ্ধতিতে রাতের বেলায় রোগীর রক্ত সংগ্রহ করা ঝামেলা ও রোগীর সহযোগিতা পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে এই পদ্ধতি দীর্ঘদিন যাবত প্রচলিত। আবার অনেক ক্ষেত্রে জীবাণুটি রক্তে পাওয়াও যায় না। 
ইমিউনোলজি বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়নের সাথে সাথে আধুনিক স্পট টেস্ট/আইসিটি/ইমুনোক্রোম্যাটোগ্রাফি পদ্ধতিতে এই রোগও কয়েক মিনিটে নির্ণয় করা যায়। শহরে, গ্রামে সব স্থানেই এই টেস্ট করা যায়। মাত্র দুই ফোঁটা রক্ত আইসিটি একটি কার্ডে দিলে সাথে সাথে ফাইলেরিয়ার জীবাণু আছে কি জানা যাবে। মাঠপর্যায়ে যেকোনো স্থানে রোগীর কাছে এই পরীক্ষা করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এই আইসিটি পদ্ধতিতে জীবাণুর উপস্থিতি সংক্রান্ত শতকরা ৯৮%-১০০% নিশ্চিত ফলাফল পাওয়া যায়, কিন্তু মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে এই জীবাণু ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। 

মাঠপর্যায়ে এই পদ্ধতিতে কোনো রোগীর বেলায় সন্দেহ দেখা দিলে তখনই রেফারেন্স ল্যাবরেটরিতে এলাইজা, ওয়েস্টার্ন ব্লট ইত্যাদি পদ্ধতি প্রয়োগ করা উচিত। এ জন্য আইইডিসিআরকে দক্ষ জনশক্তি সমৃদ্ধ একটি পূর্ণাঙ্গ রেফারেন্স ল্যাবরেটরি হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।